শনিবারেও এই এলাকা উৎসবের আনন্দে গমগম করছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে গিয়েছে চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের চেনা ছবি। শনিবার রাতে এখানে ঘটে গিয়েছে মর্মান্তিক ঘটনা। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে এক শিশু-সহ ১৯ জনের। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ২৫ জন।
রবিবার সকালে ওই এলাকায় ঢুকতে এক ভিন্ন চেহারা নজরে এল। গোটা এলাকা থমথমে। মণ্ডপ সংলগ্ন বেশির ভাগ বাড়ির জানলা বন্ধ। স্থানীয়েরা এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না কয়েক ঘণ্টা আগে সেখানে এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। একসঙ্গে এত জনের প্রাণহানি হয়েছে। এক বাসিন্দার কথায়, ‘‘শনিবার সন্ধ্যার সেই দৃশ্যের কথা মনে করলেই শিউরে উঠছি। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না, আমাদের এলাকায় এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। শুধু ওই ভয়াবহতা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।’’
মণ্ডপে ঢোকার অনেক আগে থেকেই ব্যারিকেড নজরে এল। দুর্ঘটনাস্থল এবং তার থেকে ২০ মিটার দূর পর্যন্ত ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়েছে রাস্তায়। কয়েক জন পুলিশকর্মীকেও দেখা গেল সেখানে। সরু গলি ধরে মণ্ডপের আরও কাছে এগোতেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। রাস্তার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছোট-বড় সকলের জুতো। এই দৃশ্য দেখে আন্দাজ করে নেওয়া যায় যে, সেই মুহূর্তে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কী কারণে এমন ঘটনা, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, পর্যাপ্ত পরিমাণে পুলিশ এবং ভলান্টিয়ার ছিল না সেখানে।
আরও পড়ুন:
স্থানীয়দের কথায়, ‘‘প্রতি দিন সকাল সকাল এই পাড়া জেগে ওঠে। কিন্তু শনিবারের ঘটনার পর থেকে পাড়ার ছবিটা বিষাদে বদলে গিয়েছে। যে দিকে দুর্ঘটনা ঘটেছে, রাস্তার সে দিকের জানালাগুলি বন্ধ করে রেখেছেন অনেকেই। কালকের ঘটনার পর থেকে আতঙ্ক যেন তাড়া করছে আমাদের।’’ প্রতি দিনই ভিড় বাড়ছিল এই পুজো দেখার জন্য। আশপাশের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কাতারে কাতার মানুষ গলি দিয়ে মণ্ডপ দেখতে আসছিলেন। শনিবারেও বিপুল জনস্রোত ছিল। সকলেই মণ্ডপের উদ্দেশে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। হঠাৎ চিৎকার শুনতে পান তাঁরা। এক বাসিন্দার কথায়, ‘‘জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি প্রবল ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। অনেকেই চিৎকার করছেন। তার মধ্যে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে ধাক্কাধাক্কি আরও বেড়ে যায়। তার পরই শুনতে পেলাম ধাক্কাধাক্কিতে অনেকেই পদপিষ্ট হয়েছে। পরের দৃশ্য শিউরে ওঠার মতো।’’
কী ভাবে এই দুর্ঘটনা, তা নিয়ে নানা রকম তত্ত্ব উঠে আসছে ইতিমধ্যেই। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ। তাঁরা পরস্পরকে ঠেলাঠেলি করতে থাকেন। তাতেই কয়েক জন মণ্ডপের ভিতরে বৃত্তাকার পথে পড়ে যান। পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। সূত্রের খবর, চোরবাগানের মণ্ডপে প্রবেশ করার পরে একটি বৃত্তের মতো ‘এলিভেটেড করিডর’ রয়েছে। সেখান দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে মণ্ডপ থেকে বেরোতে হবে। সেই করিডরেই বিপত্তি ঘটে বলে জানা গিয়েছে।
কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটল? তা ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের একাংশ পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলছেন। জানা গিয়েছে, এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো দেবদীপ অধিকারী এবং উত্তর কলকাতার জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ। স্থানীয় এবং মৃতদের পরিবারের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, পুজোমণ্ডপে যাওয়া এবং বেরনোর রাস্তা সরু। পুলিশ এবং দমকল সব কিছু খতিয়ে দেখে অনুমতি দিয়েছে। প্রতি বছরই বিপুল ভিড় হয়। তা হলে এ বার কেন সমস্যা হল?