ছোট ছোট জানলার ভাঙা কাচ, জানলা ঢেকে ইটের গাঁথনি, পোড়া ঘর নিয়ে এখনও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষ্য বহন করছে হোটেল ঋতুরাজ। ছ’তলার ওই হোটেলে বছরখানেক আগে পুড়ে মৃত্যু হয়েছিল ১৪ জনের।
বড়বাজারের মেছুয়া ফলপট্টিতে ওই হোটেলে আগুন লেগেছিল ২০২৫-এর এপ্রিল মাসের শেষ দিকে। মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের এক হোটেলে মঙ্গলবার রাতের অগ্নিকাণ্ডে এক শিশু, দুই মহিলা-সহ ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পরে ফের আলোচনায় উঠে এসেছে হোটেল ঋতুরাজের স্মৃতি। স্থানীয়েরা প্রশ্ন তুলছেন, ১৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতেও কি শিক্ষা হয়নি?
গত বছর ঋতুরাজের অগ্নিকাণ্ডে কোনও মতে বেঁচেছিলেন হোটেলকর্মী সঞ্জয় দাস। বুধবার সেই কথা বলতে তাঁর গলা যেন কেঁপে যাচ্ছিল। সঞ্জয় জানান, ওই রাতে ৮টা নাগাদ হোটেলের পাঁচতলায় হাউসকিপিংয়ের কাজ করছিলেন তিনি। আচমকা চার দিক ধোঁয়ায় ভরে যায়। হোটেলের ঘরগুলি থেকে আর্ত চিৎকার ভেসে আসছিল। প্রথমে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামার চেষ্টা করেন সঞ্জয়। কিছুটা নামতেই গলগল করে উপরে উঠে আসা কালো ধোঁয়া দেখে বুঝতে পারেন যে, এগোলে মৃত্যু নিশ্চিত।
তিনি বলেন, ‘‘শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বাঁচব না। চোখ বন্ধ করে ফের পাঁচতলায় উঠে যাই। পাইপ বেয়ে নামতে থাকি। ধোঁয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছিল না। দোতলা পর্যন্ত পাইপ বেয়ে নামার পরে আর পারলাম না। সেখান থেকে নীচে পড়ে গেলাম। আহত হলাম। এক সহকর্মী আমায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তখনও দমকলের দেখা পাইনি।’’
বুধবার সঞ্জয় ফোনে জানান, তিনি এখানে-ওখানে হাউসকিপিংয়ের কাজ করে কোনও মতে সংসার চালাচ্ছেন। কাশীপুরে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন। সঞ্জয়ের অভিযোগ, পুলিশ তাঁর কাছ থেকে নথি নিয়েছিল। কিন্তু আজও আর্থিক সাহায্য পাননি।
সঞ্জয় দাস।
শুধু সঞ্জয়ই নয়, সেই রাতের কথা বলতে গিয়ে গলা ভারী হয়ে যায় ওই বহুতলের নীচে থাকা এক দোকানের মালিক দুর্গাপ্রসাদ চক্রবর্তীর। তিনি জানান, হোটেলে সংস্কারের কাজ চলছিল। ওই রাতে প্রথমে দোতলায় আগুন লাগে। তবে আগুনে নয়, ধোঁয়াতেই দমবন্ধ হয়ে মারা যান অনেকে। হোটেলের এক কর্মী ঝাঁপ দিয়ে নীচে নামার চেষ্টা করলে মৃত্যু হয় তাঁর। দুর্গাপ্রসাদ বলেন, ‘‘বড় বড় জানলাগুলি বন্ধ না করে দিলে ধোঁয়া বেরিয়ে যেতে পারত।’’
ওই এলাকার অন্য ব্যবসায়ী, কর্মচারী সাহেবউদ্দিন, আকিব আনসারি-সহ একাধিক ব্যক্তির কথায়, হোটেলে ৪০-৪৫টি ঘরে লোক ছিল। জানলা থেকে বাচ্চারা আর্তনাদ করছিল। কিছুই করতে পারেননি তাঁরা। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। মঙ্গলবার রাতের ঘটনার পরে তাঁদের সকলের মুখে একটাই প্রশ্ন, ‘‘আর কত প্রাণের বিনিময়ে হুঁশ ফিরবে?’’
এই প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি। তবে শুধু হোটেল ঋতুরাজ নয়, পুরনো বহুতল, তারের জঙ্গল, প্লাস্টিকের ছাউনি, বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থে ঘেরা গোটা মেছুয়া বাজারই হুঁশ না ফেরার প্রমাণ বহন করে চলেছে।