মাত্র ১,১০০ বর্গফুট জায়গায় ছিল পাঁচটি ঘর। মির্জ়া গালিব স্ট্রিটে সেই পাঁচটি ঘর নিয়ে চলছিল, যেখানে মঙ্গলবার রাতে আগুন লেগে প্রাণ যায় ন’জনের। মৃতদের মধ্যে আরও দু’জনের পরিচয় জানা গেল শুক্রবার। তাঁরাও বাংলাদেশের বাসিন্দা। অগ্নিকাণ্ডে মৃত ন’জনের মধ্যে সাত জনই বাংলাদেশের। ঘটনার তদন্তে নেমে দমকল এবং প্রশাসনের নজরে পড়েছে একের পর এক অনিয়ম। ওই এলাকার ন’টি হোটেলকে ইতিমধ্যে শো কজ় নোটিস পাঠানো হয়েছে দমকলের তরফে। এক জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এখনও খোঁজ নেই হোটেলের মালিকের। অগ্নিকাণ্ডের পরে কিছু প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।
মঙ্গলবার রাত দেড়টা থেকে ২টোর মধ্যে ওই ঘিঞ্জি হোটেলে আগুন লেগে যায়। হোটেলের ১০ জন আবাসিকের মধ্যে মাত্র দু’জন বাঁচতে পেরেছেন। তাঁরা জানলা দিয়ে বেরিয়ে হোটেলের কার্নিসের উপর দাঁড়িয়েছিলেন দীর্ঘক্ষণ। পরে দমকল তাঁদের উদ্ধার করে। মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের হোটেলে মৃত ন’জনের মধ্যে দু’জন ভারতীয়। মৃতদের তালিকায় রয়েছেন শিলিগুড়ির বাসিন্দা ৬৮ বছরের যোগ নারায়ণ অগ্রবাল এবং ঝাড়খণ্ডের গিরিডির বাসিন্দা ১৯ বছরের সন্দীপ পাসোয়ান। সন্দীপ কলকাতায় জীবনের প্রথম চাকরিটি করতে এসেছিলেন। হোটেলের রিসেপশনের দায়িত্বে ছিলেন তিনিই। শর্ট সার্কিট থেকে সেই রিসেপশনেই আগুন লাগে। তার পরে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগ, হোটেলের কোথাও তেমন অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। জায়গা কম থাকায় ঘরগুলিতে ‘স্লাই়ডিং ডোর’-এর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। টানা একটিই ফল্স সিলিং ছিল সব ঘরের উপরে, যা কাঠের তৈরি। তার ফাঁক দিয়েই ধোঁয়া ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে বলে বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান। দমকলের সদর দফতর থেকে এই বিল্ডিংয়ের দূরত্ব মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। কলকাতা পুরসভাও রয়েছে ৯৫০ মিটারের মধ্যে। এত অব্যবস্থা, অনিয়ম কেন কারও চোখে পড়েনি, প্রশ্ন উঠছে। ইতিমধ্যে মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ন’টি গেস্ট হাউস এবং চারটি রেস্তরাঁকে শো কজ় করেছে দমকল বিভাগ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সন্তোষজনক উত্তর না-পাওয়া গেলে সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। ঘটনায় বৃহস্পতিবার এক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতার এক
কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে আবু জ়াফর নামে এক ব্যক্তিকে। সূত্রের খবর, নিউ মার্কেটে মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের হোটেল ‘শিখা ইন’ তাঁর নামেই লিজ় (ইজারা) নেওয়া হয়েছিল। বুধবার রাতেই তাঁকে আটক করা হয়েছিল। ওই হোটেলের মালিক বীরেশ্বর মিত্রের এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি। জ়াফর জোড়াসাঁকোর বাসিন্দা। গত রাতে এন্টালি মার্কেট এলাকা থেকে তাঁকে পাকড়াও করে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ। জিজ্ঞাসাবাদের পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি আরও দু’জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের নাম-পরিচয় এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সূত্রের খবর, আটক হওয়া দু’জনের মধ্যে হোটেল ‘যাপন’-এর কর্মীও রয়েছেন। মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের যে হোটেলে আগুন লেগেছিল, তার কাছেই রয়েছে এই হোটেলটি। তার মালিকও বীরেশ্বরই।
স্ত্রীর নামে লিজ়
মাসিক ৪০ হাজার টাকার চুক্তিতে নিউ মার্কেটের ওই হোটেলের ইজারা (লিজ়) নিয়েছিলেন ধৃত জ়াফর। নথিপত্র সবই রয়েছে তাঁর স্ত্রীর নামে। কিন্তু আবুর স্ত্রীকে এখনও পুলিশ খুঁজে পায়নি। সূত্রের খবর, পাঁচ মাস আগে বীরেশ্বরের কাছ থেকে তিনি ‘শিখা ইন’ লিজ় নেন। ১১ মাসের চুক্তি হয়েছিল। প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা মালিককে দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। স্ত্রীর নামে হোটেল লিজ় নেওয়া হলেও তা দেখাশোনা করতেন আবু নিজেই। পুলিশ জানতে পেরেছে, হোটেলের ইজারা সংক্রান্ত সমস্ত নথি তাঁর স্ত্রীর কাছে রয়েছে। তাঁর খোঁজে তল্লাশি চলছে। ওই একই বিল্ডিংয়ের পাঁচতলায় ‘শিখা ইন’ নামের আরও একটি হোটেল রয়েছে। তা-ও বীরেশ্বরের মালিকানাধীন। মঙ্গলবার রাতের ঘটনার পর তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। আবুকে বৃহস্পতিবার ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি পুলিশি হেফাজতে থাকবেন।
আরও পড়ুন:
আরও দুই
নিউ মার্কেটের মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মোট ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাত জনের পরিচয় বুধবারই জানা গিয়েছিল। বাকি দু’জনকে শনাক্ত করা গেল বৃহস্পতিবার। তাঁরাও বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁদের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ হাই কমিশনের নথির সঙ্গে হোটেলের নথি, পাসপোর্ট ইত্যাদি মিলিয়ে দেখে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। মৃতদের নাম এসএম আলিমুজ্জামান (৪৫) এবং রেবতী সরকার। তাঁরা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। এই নিয়ে অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়াল সাত। বাকিরা হলেন ৭৪ বছরের আক্রম আলি, ৩৯ বছরের দেবাশীষ দত্ত, ২৭ বছরের আফসানা শারমীন এবং ২ বছর ৮ মাস বয়সি শিশু স্বর্ণশীষ দত্ত। তাঁরা একই পরিবারের সদস্য। চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে এসেছিলেন। দেবাশীষ ছিলেন পেশায় সাংবাদিক। এ ছাড়া, বাবু আহমেদ (৩৭) নামের আরও এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। সকলেই মূলত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন। হোটেলের ঘরে বিছানার উপর, মেঝেতে এবং শৌচালয়ে দেহগুলি পড়েছিল।
দমকলের পদক্ষেপ
অগ্নিকাণ্ডের পরে মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ৯টি হোটেল এবং ৪টি রেস্তরাঁকে সুরক্ষাবিধি না-মানার অভিযোগে শো কজ় করেছে দমকল দফতর। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয়েছে। মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা একটি ভবনে একাধিক হোটেল ও অতিথিনিবাস চলছিল। প্রতিটিতে ঘুপচি ঘুপচি ঘর। ওই ভবনেরই তিনতলায় ১১০০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে চলছিল হোটেল ‘শিখা ইন’। বিস্তর গলদ এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে এই হোটেল ঘিরে। দু’কামরা ফ্ল্যাটের সমান জায়গায় ছিল খুপরি পাঁচটা ঘর।