কোথাও অতিকায় গর্ত, কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা। সামান্য বৃষ্টিতেই তাতে জল জমে শহর জুড়ে বিছিয়ে থাকছে ফাঁদ। পথের এই বিভ্রাটের জেরে তৈরি হওয়া যানজটে মানুষের ভোগান্তি দুর্বিষহ পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে বলেও অভিযোগ। পরিস্থিতি এমনই যে, স্বল্প দূরত্বের পথ পেরোতে দ্বিগুণ সময় লাগছে। এরই মধ্যে সোমবার শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে রাতের ভারী বর্ষণ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। কোথাও কোমর, কোথাও বা হাঁটুজলে ডুবে থাকা ভাঙা রাস্তায় পড়ে ছোটখাটো দুর্ঘটনার খবরও রাত পর্যন্ত এসেছে। কার্যত থমকে থেকেছে কোনও কোনও রাস্তার ট্র্যাফিক।
এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারে জোড়াতালি নয়, কবে হবে শহরের রাস্তার পুরোদস্তুর মেরামতি? জানতে চাইছে শহরবাসী। কিন্তু নিরুত্তর কলকাতার পুর প্রশাসক।
অথচ, রাজ্যে পালাবদলের পরে মেয়রের পদ থেকে ফিরহাদ হাকিম সরে দাঁড়ানোয় গত ৮ জুন পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেকে পুর প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। তখন দাবি করা হয়েছিল, পুর পরিষেবা সুষ্ঠু ভাবে প্রদান করা হবে। কিন্তু সেই ‘অভিভাবকহীন’ হয়েই রইল কলকাতা পুরসভা। বিভিন্ন পরিষেবা সংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে অন্যতম শহরের রাস্তার বেআব্রু দশা। সোমবার শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে ঘুরে সেই ছবিই প্রকট হল। এই সমস্যা থেকে মুক্তি কবে? আশ্বাস বা উত্তর মেলেনি বর্তমান পুর প্রশাসকের থেকে।
প্রায় দশ মাস ধরে ভেঙেচুরে পড়ে উত্তরের চিড়িয়ামোড় থেকে দমদম স্টেশন পর্যন্ত দমদম রোডের বিস্তীর্ণ অংশ। নিকাশির বিশাল বিশাল পাইপ বসানোর জন্য গোটা দমদম রোড গভীর ভাবে খোঁড়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সেই কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। এখনও রাস্তার অবস্থা দুর্বিষহ। নিত্যদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। পুরসভার রাস্তা বিভাগ জানাচ্ছে, নিকাশি দফতর রাস্তা কেটেছে। তাই মেরামতিও ওই দফতরই করবে। কিন্তু কবে? জানা নেই। পুর নিকাশি দফতরের দাবি, দমদম রোডের ২.৬ কিলোমিটার অংশে নিকাশির পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। ওই কাজ শেষ হয়নি। বর্ষা না গেলে রাস্তার কাজ শুরু হবে না। জরুরি ভিত্তিতে ঝামা ফেলে জোড়াতালির কাজ চলছে বলে দাবি দফতরের এক আধিকারিকের। যদিও সোমবার সেখানে দেখা গেল, রাস্তার দশা এতটাই বেহাল যে, গাড়ি, বাস নৌকার মতো দুলে দুলে চলছে। দমদম রোড জুড়ে যানজট এখন আতঙ্ক।
উত্তরের কাশীপুর রোডের একাধিক অংশে তাপ্পি দেওয়া হলেও ফের গর্ত হচ্ছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে নর্থ ক্যালকাটা পলিটেকনিক কলেজের সামনে গোবিন্দ মণ্ডল রোডের অবস্থাও তথৈবচ।
দক্ষিণের তারাতলা রোডের একাংশের সঙ্গিন দশায় পথের বিপদ বাড়ছে। স্থানীয়েরা জানাচ্ছেন, দু’চাকার গাড়ি গর্তে পড়ে উল্টে যাচ্ছে। একই দশা কালীঘাট মেট্রো স্টেশনের সামনে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়েরও। কলকাতা পুরসভার রাস্তা বিভাগের এক শীর্ষ আধিকারিক জানাচ্ছেন, তারাতলা রোড কলকাতা বন্দরের অধীনে। ওই রাস্তা সারাতে কলকাতা বন্দরকে বলা হয়েছে। কলকাতা পুরসভার অধীনে থাকা বাকি রাস্তা দ্রুত মেরামত করা হবে।
পার্ক সার্কাসের চার নম্বর সেতুতে খানাখন্দের জেরে যানজট রোজের সমস্যা বলে জানাচ্ছেন স্থানীয় ট্র্যাফিক পুলিশকর্মীরাই। সেতুর বড় বড় গর্তে দু’চাকার যান পড়লে বিপদ ঘটে যাচ্ছে। ওই সেতু কেএমডিএ-র অধীনে। পুরসভার রাস্তা বিভাগের এক আধিকারিকের বক্তব্য, রাস্তার দ্রুত সংস্কার করতে কেএমডিএ-কে বলা হবে। ওই সেতু থেকে পার্ক সার্কাস কানেক্টরের বিভিন্ন অংশেরও একই বেহাল দশা। তপসিয়া মোড়ের কাছে দীর্ঘ দিন ধরে রাস্তায় বড় বড় গর্ত হয়ে রয়েছে। ট্র্যাফিক পুলিশকর্মীরা জানাচ্ছেন, ব্যস্ততম এলাকা ওই মোড়। দু’চাকার যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাওয়ার ঘটনা এখানে লেগেই থাকে। রাস্তা দ্রুত না সারালে বড় বিপদের আশঙ্কা দেখছেন নিত্যযাত্রীরা।
ইএম বাইপাসের অজয়নগর মোড়, ঢালাই সেতু থেকে শুরু করে বিভিন্ন অংশেরও একই রকম বেহাল পরিস্থিতি। তবে, ঢালাই সেতুর কাছে রাস্তার বিরাট অংশ জুড়ে বড় বড় গর্তের জন্য বিপদ বাড়ছেই।
শহরের বেহাল রাস্তাগুলির সংস্কার কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে জানতে কলকাতা পুরসভার প্রশাসক তথা পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেকে ফোন করা হলে সেটি বেজে গিয়েছে। এসএমএস বা ওয়টস্যাপ করা হলেও উত্তর দেননি।