অবশেষে পুজোর দখল নিল পুলিশ। সেই সঙ্গেই কার্যত তুলে দেওয়া হল ভিআইপি পুজো দর্শনের দীর্ঘদিনের প্রথা। রবিবার দ্বিতীয় সপ্তমীর সন্ধ্যা থেকেই যা নিয়ে জায়গায় জায়গায় পুজো কমিটির ঘোষণা শুরু হল। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হল, ‘‘পুজোয় আর কোনও ভিআইপি লাইন রাখা হচ্ছে না। পুলিশই সমস্তটা নিয়ন্ত্রণ করছে। সাধারণ লাইনে নিয়ম মেনে ঠাকুর দেখুন।’’
এই ব্যবস্থাই চলল সোমবার অষ্টমীতেও। কিছু কিছু পুজো মণ্ডপে আবার ছবি বা ভিডিয়ো তুললেই পুলিশের তরফে ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পরে থানা থেকে ফোন নিতে হবে বলে ঘোষণাও হয়েছে সেই সব মণ্ডপে। তাতে অবশ্য পুজো জনতার উৎসাহে তেমন ভাটা চোখে পড়ল না। রাতভর বেশ কিছু মণ্ডপে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও অনেকেরই দাবি, চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা সার্বিক পুজো আবহে গভীর প্রভাবফেলেছে। অনেকেই পথে বেরোলেও ভিড় এড়িয়ে চলতে চাইছেন। তার মধ্যেই এখন পুলিশকে তৎপর হতে দেখে অনেকে বলছেন, ‘‘এতগুলো মৃত্যুর পরে কেন টনকনড়ল? অন্যান্য বছরের মতো কেন এ বার প্রথম থেকেই পুলিশ সক্রিয় হল না?’’
এ দিন অষ্টমীর রীতি মেনে পুজো শুরু হয় মণ্ডপে মণ্ডপে। ঐতিহ্য মেনে বেশ কিছু জায়গায় কুমারী পুজো হয়েছে। সকালের অঞ্জলি সেরে অনেকেই বেরিয়ে পড়েছেন মণ্ডপে ঘুরতে। তার মধ্যেই সন্ধ্যায়ম্যাডক্স স্কোয়ারের পুজো মণ্ডপে হাজির হয়েছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং অভিনেতা রাজকুমার রাও। সেখানে চোরবাগানের পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা নিয়ে সৌরভকে দুঃখপ্রকাশ করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘‘নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনও আনন্দই আর আনন্দ থাকে না। এমন যেন আগামী দিনে কখনও না হয়, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।’’
অনেকেরই দাবি, ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আটকাতে এখন ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা চোখে পড়ছে। রবিবারই যেমন শহরেরসমস্ত বড় পুজো মণ্ডপ চত্বরে গিয়ে নতুন করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে পুলিশের বিশেষ দল। তার মধ্যেই ত্রিধারা, চেতলা অগ্রণী এবং বালিগঞ্জ কালচারাল পুজো কমিটির কর্তাদের চিঠি দিয়ে বেশ কিছু পরিবর্তনের কথা বলেছে পুলিশ। কোথাও আলো আরও বাড়াতে বলা হয়েছে, কোথাও মণ্ডপের ভিতরের দমবন্ধকর পরিস্থিতি কাটাতে আবহাওয়া ঠান্ডা করার আরও যন্ত্র বসাতে বলা হয়েছে।
বালিগঞ্জ কালচারের পুজো কর্তা তথা ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন উকিলবলেন, ‘‘আমাদের মণ্ডপের একটি কাঠামো খুলে ফেলতে এবং আরও একটু আলো বাড়াতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমরা সেই নির্দেশ মতো কাজ করে ফেলেছি। প্রশাসন যেমন নির্দেশ দেবে, প্রতিটি পুজো কমিটিকে সেই মতো কাজ করতে ফোরামের তরফে বলা হয়েছে।’’
সূত্রের খবর, কলকাতার বেশ কয়েকটি বড় পুজো কমিটির জন্য নির্দিষ্ট এক জন করে আইপিএস অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সপ্তমীর রাতের মধ্যে তাঁরা পুজো মণ্ডপগুলি ঘুরেসেখানকার পুজো কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছেন। দক্ষিণের এমনই একটি পুজোর কর্তার মন্তব্য, ‘‘গেট কিছুটা বদলানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের যাতায়াতেরপথে কিছু বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গেই সমস্ত রকমের ভিআইপি পাস বাতিল করে পুলিশের তরফে একটি মাত্র লাইন করে বুঝেবুঝে দর্শনার্থীদের মণ্ডপে ঢোকানো হচ্ছে।’’
এর মধ্যেই আলোচনা চলছে ত্রিধারার ভিড় নিয়ে। কোনও রকম বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে সেখানে। ওই পুজোর কর্তা দেবাশিস কুমার বলেন, ‘‘ভিআইপি লাইন বলে আর কিছুই রাখা হয়নি। মণ্ডপ পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যাওয়ার প্রায় সমস্ত পথ পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে। পুরোটাই এখন পুলিশ সামলাচ্ছে।’’ সেখানেই চোখে পড়ল রাতভর বাঁশের উপরে বসে বাঁশি বাজিয়ে দর্শনার্থীদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বলছেন পুলিশকর্মীরা।
যা দেখে প্রবল ভিড়ে দাঁড়ানো এক দর্শনার্থীর মন্তব্য, ‘‘এই ছবিটাই এ বার শুরুর ক’দিন চোখে পড়ছিল না। অনভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ কী করছিল কে জানে!’’ আর এক দর্শকের মন্তব্য, ‘‘নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পুলিশ নিজেই বুঝে বুঝে মণ্ডপ পর্যন্ত লোক নিয়ে এসে ঠাকুর দেখাচ্ছে। এটাই ঠিক পদ্ধতি।’’ হাতিবাগানের এক পুজো চত্বরে ভিড় থেকে এক জন বললেন, ‘‘এই নিয়ম টিকবে তো? সামনের বছর থেকেই আবার না ভিআইপি কালচার পুজো গ্রাস করে!’’