ফাঁকা জমি দেখলেই গ্রিল বসিয়ে, নীল-সাদা রং করে তৈরি করে ফেলা হয়েছে পার্ক। দিনকয়েকের মধ্যেই কয়েকটি দোলনা বসিয়ে সংশ্লিষ্ট বরোর নাম লেখা বোর্ড ঝুলিয়ে লিখে দেওয়া হয়েছে পুর উদ্যান! এমন রাতারাতি উদ্যান তৈরির ‘প্রকল্প’ থেকে বাদ যায়নি ব্যক্তিগত জমিও। অন্যান্য সরকারি দফতরের ফাঁকা জমির ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। অভিযোগ, পার্ক তৈরির আগে বহু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানানোই হয়নি। এখন এই সব পার্কের বেশির ভাগ তালাবন্ধ। রক্ষণাবেক্ষণের লোক নেই। মানিকতলা থানার কাছে এমন পার্কে আবার লোহার ছাঁট বাছাই হয়!
শহর জুড়ে তৈরি হওয়া পুরসভার এমন বহু পার্কই এই মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে। নাগরিকদের বড় অংশই জানাচ্ছেন, নগরায়ণের কারণে পাড়ায় পাড়ায় খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রবীণদের হাঁটার, সময় কাটানোর জায়গাটুকু নেই। এই পরিস্থিতিতে এক সময়ে পুরসভার তৈরি এই উদ্যানগুলি আশ্বস্ত করত তাঁদের। কিন্তু দিনকয়েকের মধ্যেই অধিকাংশ পার্কে তালা পড়তে শুরু করে। এক সময়ে পুরপ্রতিনিধিদের জানালে বা বরো কার্যালয়ে অভিযোগ করলে কাজ হত। কিন্তু এখন পুরবোর্ড না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় নিষ্ক্রিয় প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধিরা। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন পুর নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে না তো?
কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, এই মুহূর্তে শহরে পুর উদ্যান বিভাগের অধীনে অন্তত ৮০০টি পার্ক আছে। কিন্তু, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখাশোনার লোক নেই। এক পুরকর্তা জানাচ্ছেন, উদ্যান বিভাগে ২৮৪ জন স্থায়ী মালি থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৩১ জন। কিছু জায়গায় অস্থায়ী মজুরদের দিয়ে কাজ করানোর চেষ্টা হলেও পুরপ্রতিনিধিরা কেউই সক্রিয় না থাকায় সেই কাজও বন্ধ।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৫ সালের পরে কলকাতা পুরসভার উদ্যান বিভাগ পৃথক ভাবে গঠিত হয়। তার আগে এই বিভাগ ছিল রাস্তা দফতরের অধীনে। পুরসভা সূত্রের খবর, উদ্যান বিভাগ পৃথক ভাবে গঠিত হওয়ার পরে মালির ২৮০টি স্থায়ী পদ তৈরি হয়। প্রথম দিকে সব পদেই মালি ছিলেন। সমস্যার সূত্রপাত ২০১০-এর পরে। অনেক মালি অবসর নিলেও স্থায়ী নিয়োগ আর হয়নি। সঙ্কট মেটাতে কয়েক বছর আগে পুরসভার ১৪৪ জন পুরপ্রতিনিধিকে চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছিল, তাঁরা যেন তাঁদের ওয়ার্ড থেকে চার জন করে ১০০ দিনের কর্মী বেছে দেন, যাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মালির কাজ করানো যাবে। সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি। পুরসভায় এক সময় উদ্যানপালকের ছ’টি পদ ছিল। তাঁরা অবসর নেওয়ার পরে ওই পদেও নিয়োগ হয়নি। বদলে, ২০১৩ সালে ছ’জন অস্থায়ী উদ্ভিদবিজ্ঞানী নিয়োগ করে পুরসভা।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও অবশ্য পার্ক তৈরিতে উৎসাহের অভাব চোখে পড়েনি। এক সময় বরো অফিসকে দিয়ে পার্ক তৈরি করানোর হিড়িক পড়ে কলকাতায়। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে আসে। পাড়ায় পাড়ায় পুরপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ হিসাবে কয়েক জন ফাঁকা জমি খুঁজে বেড়াতে শুরু করেন। জমি পাওয়া গেলে নিজের লোককে দরপত্রের জন্য আবেদন করতে বলা হয়। অভিযোগ, দরপত্র পাইয়ে দেওয়া বাবদ চলতে থাকে মোটা টাকার খেলা। এই পরিস্থিতিতে জানিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে সেখানে পার্ক তৈরি করা যাবে না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট বরোর এগ্জিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারদের উদ্যান দফতরের ডিরেক্টর জেনারেলের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে। কোথায় পার্ক হবে, খরচ কত— জানাতে হবে সে সব তথ্য। তার পরেই সেই সংক্রান্ত ফাইল তৈরি করা যাবে। এর পরে সিদ্ধান্ত হয়, কোথাও পার্ক হবে কিনা, সে ব্যাপারে কেন্দ্রীয় পুর ভবন সিদ্ধান্ত নেবে।
বর্তমানে পুর বাজেট থেকে পার্কের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। জমির চরিত্র, মালিকানা বুঝে পার্কের অনুমতি মেলে। ফাইলে চূড়ান্ত সিলমোহর দেন পুর প্রশাসক। কিন্তু দিনের পর দিন তালাবন্ধ পার্ক খোলার বন্দোবস্ত হয় না। বাগবাজার এলাকার বাসিন্দা এক বৃদ্ধের মন্তব্য, ‘‘পার্ক নিয়ে কী টাকার খেলা চলেছে, সকলে জানেন। শ্রীবৃদ্ধির নামে তৈরি এক-একটি পার্ক ঘায়ের মতো রয়ে গিয়েছে।’’