এক-এক জন শিক্ষককে এক-একটি শ্রেণির দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি শ্রেণির ক্ষেত্রেই পড়ুয়াদের পড়াশোনার মানোন্নয়ন ঘটানোর দায়িত্বথাকবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের উপরে। যদি কোনও শ্রেণির পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে তা না হয়, তা হলে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে। বৃহস্পতিবার রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ প্রাথমিকের শিক্ষকদের উদ্দেশে এই বার্তা দিয়ে জানান, যদি দেখা যায়, পড়ুয়াদের পড়াশোনার মান উন্নত হয়নি, তা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকেরবেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়াও আটকে যেতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিকের শিক্ষকদের প্রশ্ন, তাঁর এই প্রস্তাব কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের। প্রাথমিক স্কুলগুলিতে এত শিক্ষক আছেন তো? ওই শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণির জন্য এক জন করে শিক্ষককে দায়িত্ব দিতে গেলে প্রতিটি স্কুলে অন্তত ছ’জন করে শিক্ষক লাগবে। কিন্তু ছ’জন তো দূরের কথা, অনেক প্রাথমিক স্কুলই চলছে স্রেফ দু’জন শিক্ষক নিয়ে। সে ক্ষেত্রে সবক’টি শ্রেণির দায়িত্ব ওই দু’জন মিলে কী ভাবে নেবেন? শিক্ষকদের একাংশের মতে, শিক্ষামন্ত্রীর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে গেলে আগে প্রাথমিক স্কুলে আরও শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, এখন রাজ্যের স্কুলগুলিতে গড়ে ২৫-২৬ জন পড়ুয়া-পিছু এক জন করে শিক্ষক রয়েছেন। আগামী কিছু দিনের মধ্যেপ্রাথমিকে ১৩ হাজার শিক্ষককে নিয়োগ করার কথা। সেই নিয়োগ হয়ে গেলে ২০ জন পড়ুয়া-পিছু এক জন করে শিক্ষক থাকবেন। সেটাই হবে ছাত্র-শিক্ষক সংখ্যার আদর্শ অনুপাত। তাঁর প্রশ্ন, তা হলে কেন এক-এক জন শিক্ষক এক-একটি শ্রেণির বা ২০-২৫ জন পড়ুয়ার দায়িত্ব নিতে পারবেন না? যার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকদের একাংশের পাল্টা দাবি, শিক্ষামন্ত্রী যে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের কথা বলছেন, সেটা রাজ্য-ভিত্তিক গড় হিসাব। কিন্তু বহু স্কুলেই গেলে দেখা যাবে, বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন।
‘উস্তি ইউনাইটেড প্রাইমারি টিচার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর তরফে রাজীব দত্ত বলেন, ‘‘আমি পূর্ব বর্ধমানের যে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করি, সেখানে আমি বাদে রয়েছেন শুধু প্রধান শিক্ষক। শিক্ষা দফতরের বিভিন্ন রকম প্রকল্পের রূপায়ণ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় তাঁকে। তিনি পড়ানোর সময়ও কম পান।তা হলে আমার একার পক্ষে বা আমি ও প্রধান শিক্ষক মিলে কি পুরো স্কুলের প্রত্যেক পড়ুয়ার দায়িত্ব নিতে পারব? আমাদের স্কুলের মতো এমন বহু স্কুল রয়েছে, যেখানে এক জন বা দু’জন শিক্ষক রয়েছেন।’’ রাজীবের মতে, ‘‘শিক্ষার অধিকার আইনে বলা আছে, প্রতিটি শিশুরই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু শিক্ষকের সংখ্যা প্রাথমিকে এখন এতই কম যে, সেই অধিকার থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। এখন এমনই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, তৃতীয় শ্রেণির বহু পড়ুয়াওছোট ক্লাসের সাধারণ অঙ্ক কষতে পারে না বা সাধারণ বাক্য লিখতে পারে না।’’
যদিও রাজ্যে বিজেপির শিক্ষক সেলের মুখ্য আহ্বায়ক তথা প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অ্যাড-হক কমিটির সদস্য পিন্টু পাড়ুই মনে করেন, পড়ুয়াদের পড়াশোনারমানোন্নয়নের জন্যই শিক্ষামন্ত্রীর এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, ‘‘অনেক স্কুলে দু’জন শিক্ষক রয়েছেন ঠিকই, কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এর পর থেকে প্রাথমিক স্কুলগুলিতে অন্তত তিন জন করে শিক্ষক থাকবেন। তিন জন শিক্ষকের প্রত্যেকে দু’টি করে শ্রেণির দায়িত্ব নিলে শিক্ষামন্ত্রী যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তার রূপায়ণ সম্ভব। শিক্ষামন্ত্রী আসলে পড়ুয়াদের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যে দিয়ে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা তৈরি হওয়ার কথা বলেছেন।’’