পুজোর ক’দিন ভিড় নিয়ন্ত্রণ থেকে সব বন্দোবস্ত ঘিরে পুলিশি ভূমিকায় যে প্রশ্ন উঠেছিল, তারই পুনরাবৃত্তি কি চোখে পড়ছে বিসর্জনের ক্ষেত্রেও? শহরের মোট ৬৮টি জায়গায় বিসর্জন চলছে। সেখানকার পরিস্থিতি দেখে এমনই প্রশ্ন পুজো উদ্যোক্তাদের অনেকের।
তাঁদের অভিযোগ, বেশির ভাগ জায়গায় সমন্বয়ের অভাব চোখে পড়ছে। পুলিশের উপস্থিতিও বহু জায়গায় কম। প্রতিমা নিরঞ্জনে দেরির অভিযোগও করছেন অনেকেই। যদিও কলকাতা পুলিশ দাবি করেছে, বিসর্জনের প্রথম দু’দিন, বুধ এবং বৃহস্পতিবার বাড়ি ও
বারোয়ারি মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রতিমা নিরঞ্জন সুষ্ঠু ভাবে হয়ে গিয়েছে।
বিভিন্ন ঘাটে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা লোকজনের দাবি, এ দিন বৃহস্পতিবার হওয়ায় বুধবারের চেয়ে কম প্রতিমা বিসর্জনে এসেছে। বেশি বিসর্জন হয়েছে বাবুঘাট, বাজেকদমতলা ঘাট এবং উত্তরের শোভাবাজার, বাগবাজার সংলগ্ন ঘাটগুলিতে। কিন্তু সর্বত্রই রাতভর বিসর্জন হয়েছে। এ বারই প্রথম বিসর্জনের জন্য ‘ফর্ক লিফট কার’ ব্যবহার করা হচ্ছে। পুজো কমিটির কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, এ বার ক্রেনে করে প্রতিমা টেনে নামানোর দৃশ্য দেখা যাবে না। প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য ক্রেন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। সেই কারণেই এই ‘ফর্ক লিফট কার’ ব্যবহার হচ্ছে। পুরসভার এক কর্মীর মন্তব্য, ‘‘এই ধরনের গাড়ি বড় বড় প্রতিমা নামানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে। ট্রেলারের সঙ্গে আটকে গিয়ে এই গাড়ি এক ধরনের যান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিমা টেনে সামনে আনছে। তার পরে ঘাটে নিয়ে যাচ্ছে ওই গাড়ি। সেখান থেকে মোটবাহকেরা প্রতিমা জলে ফেলার ব্যবস্থা করছেন।’’ রাতভর ডিউটি করা এক পুলিশকর্মীর মন্তব্য, ‘‘এই পদ্ধতির জন্যই বিসর্জনে কিছুটা বাড়তি সময় লাগছে। তবে সমস্তটাই সুষ্ঠু ভাবে হচ্ছে।’’
পুলিশ সূত্রের খবর, কলকাতার ৬৮টি ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন হচ্ছে। যার মধ্যে গঙ্গার ঘাট ২৪টি। আগামী শনিবার পর্যন্ত সমস্ত জায়গা মিলিয়ে ৬১১ জন পুর আধিকারিক বিসর্জন তদারকির জন্য থাকছেন। এ ছাড়াও রয়েছে ৪৩টি পুর-স্বাস্থ্য দল। রাখা হচ্ছে পুরসভার সাতটি অ্যাম্বুল্যান্স এবং ১২টি বায়ো টয়লেট। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকেও (এনডিআরএফ) রাখা হচ্ছে বিসর্জনের জন্য। পুরসভা সূত্রের খবর, এমন আটটি দলের প্রতিটিতে থাকছেন ৩৫ জন এনডিআরএফ কর্মী।
এই বছর পুজোর সামগ্রী জলে ফেলা রুখতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে পুরসভার কর্তারা জানাচ্ছেন। সেই কারণে বিসর্জনের ঘাটগুলিতে পুজোর দ্রব্য ফেলার আলাদা ব্যবস্থাও হয়েছে। রাখা হয়েছে একশো দিনের কর্মীদের। সেখানে সমস্তটা রেখে শুধু প্রতিমা নিয়েই নিরঞ্জনে যেতে দেওয়া হচ্ছে। বাড়ি বা বারোয়ারি পুজোর চার জন করে প্রতিনিধিকে প্রতিমার সঙ্গে জলের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে। কোনও শিশুকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে খবর।
রেলের কাজের জন্য এ দিন সকালে বাজেকদমতলা ঘাটে কিছু ক্ষণ বিসর্জন-পর্ব বন্ধ রাখতে হয়। পাশের ঘাটে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার পথে এক পুজো উদ্যোক্তা বললেন, ‘‘আগাম ঘোষণা করলে এতটা ঝক্কি হয় না। আশপাশের পাড়ার যাঁরা রাতে বিসর্জন করে গিয়েছেন, তাঁদের থেকেও শুনেছি, প্রতিটি প্রতিমা বিসর্জনে ঘণ্টাখানেক লেগে যাচ্ছে।’’ শোভাবাজার ঘুরে উত্তর কলকাতার ঘাটে বিসর্জন দিতে যাওয়া বেলেঘাটার এক পুজো কর্তার মন্তব্য, ‘‘যে রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে, সেই পথেই প্রতিমা পাঠানো হচ্ছে। চরম হয়রানি হয়েছে। রাতে প্রায় তিন ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকেছি। পুলিশি বন্দোবস্ত আরও ভাল হওয়া উচিত ছিল।’’