Advertisement
E-Paper

চোরবাগানের নতুন কমিটি বদল করে নিরাপত্তা সংস্থাও! কতটা সমন্বয় ছিল পুলিশের সঙ্গে? খুঁজল আনন্দবাজার ডট কম

এই প্রথম নয়, ভিড় আগেও হয়েছে চোরবাগানে। বৃষ্টিও হয়েছে। তা হলে এ বার আলাদা কি হল, যার জন্য এই বিপর্যয়?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ২০:০৪

— ফাইল চিত্র।

উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে পুলিশ, ভিড় সামলানো বা আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘অনভিজ্ঞতা’-ই কি চোরবাগানের বিপর্যয়ের মূল কারণ? আনন্দবাজার ডট কম খোঁজ করতে গিয়ে পেয়েছে এ রকম আরও কিছু তথ্য, যা অনভিজ্ঞতা এবং পেশাদারিত্বের অভাবের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

এই প্রথম নয়, ভিড় আগেও হয়েছে চোরবাগানে। বৃষ্টিও হয়েছে। তা হলে এ বার আলাদা কি হল, যার জন্য এই বিপর্যয়? এর আগে পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থা, কমিটির পুরনো এবং নতুন সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আনন্দবাজার ডট কমের চোখে পড়েছে বেশ কিছু ‘অসঙ্গতি’।

পুজো উদ্যোক্তাদের একাংশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, পুজো কমিটির পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছিল পুজোয় ভিড় সামলানোর বরাত পাওয়া বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাও। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চোরবাগানের ভিড় সামলানোর কাজ করত ব্যরাকপুরের বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা স্পেশ্যাল সিকিউরিটি সার্ভিসেস। সংস্থার এক কর্তা সেখ মিরাজুদ্দিন আনন্দবাজার ডট কমকে জানান, সন্ধ্যা এবং রাতে দু’জন অভিজ্ঞ সিকিউরিটি ম্যানেজারের নেতৃত্বে ৭০ জন করে নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন থাকতেন চোরবাগানের ভিড় সামাল দিতে।

কী ভাবে কাজ করতেন এই নিরাপত্তারক্ষীরা? মিরাজুদ্দিনের কথায়, মূল মণ্ডপে প্রায় ২০০ দর্শনার্থী একসঙ্গে ভাল ভাবে ঢুকতে পারেন। কিন্তু নিরাপত্তার স্বার্থে কখনওই একসঙ্গে ১৫০ জনের বেশি ঢুকতে দেওয়া হত না। এই সংখ্যা নিশ্চিত করতে সেন্ট্রাল অ্যভিনিউ থেকে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট হয়ে মণ্ডপে ঢোকার পথে অন্তত তিন জায়গায় ‘ড্রপ গেট’ করা হত, যাতে ভিড়টাকে মণ্ডপের অনেক আগেই ভাগ করে দেওয়া যায় এবং ভিড়ের চাপ সরাসরি মণ্ডপে না পড়ে। এর জন্য দুই ম্যানেজার প্রবেশ এবং প্রস্থান দুই পথে নজর রাখতেন। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেন ওয়াকিটকিতে। মণ্ডপের মধ্যে থাকা দুই-তৃতীয়াংশ দর্শনার্থী প্রস্থান করার আগে পর্যন্ত নতুন করে কোনও দর্শনার্থীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হত না।

পুরনো কমিটির এক সদস্য মিরাজুদ্দিনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে জুড়েছেন আরও কয়েকটি বিষয়। পুরনো কমিটির সদস্য বলেন, ‘‘ড্রপ গেটে আটকানোর পরেও কখনও কখনও মণ্ডপে ঢোকার মুখে ভিড় লাগামছাড়া হয়ে যেত। তখন আমরা মণ্ডপটি যে পার্কে হয়, সেখনকার মূল লোহার ফটক বন্ধ করে দিতাম। যাতে কোনও ভাবেই মণ্ডপে কেউ ঢুকতে না পারেন। সেই ফটকও এ বারের থিমে মণ্ডপের অংশ করে ফেলা হয়েছে।’’

নতুন কমিটির সদস্য উত্তম সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আনন্দবাজার ডট কম। তিনি বলেন, ‘‘নতুন কমিটিতে তাঁর নাম থাকলেও তিনি জানেন না নতুন কোনও নিরাপত্তা সংস্থাকে নিয়োগ করা হয়েছিল বা কত জন নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন ভিড় সামলাতে।’’ তবে স্থানীয়দের দাবি, আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী দেখা গিয়েছে এ বছর। পুলিশ ইতিমধ্যেই দু’জন বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। তার মধ্যে রয়েছেন গোঘাটের রাজেশ পাল। তাঁর পরিবারের দাবি, পেশায় মূলত দিনমজুর রাজেশ পুজোর ক’দিন অতিরিক্ত রোজগারের আশায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজে গিয়েছিলেন। ধৃত অন্য নিরাপত্তাকর্মী সুমন চক্রবর্তীর বাড়ি বসিরহাটের একটি গ্রামে। তাঁর পরিবারের দাবি, সুমন ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না। ঘটনার পর থানায় গেলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সঙ্গে সুমনের পরিবারের দাবি, পুজোর ক’দিন কাজ করার জন্য সুমনকে সরাসরি নিয়োগ করেছিল ক্লাব। এর থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ধৃতেরা কেউই প্রশিক্ষিত এবং পেশাদার নিরাপত্তাকর্মী নন। আর তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মিরাজউদ্দিন। তিনি বলেন,‘‘আমাদের কর্মীরা দীর্ঘদিন চোরবাগানে কাজ করার ফলে একটা অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা নতুন সংস্থা বা সরাসরি ক্লাব নিযুক্ত নিরাপত্তারক্ষীদের ছিল না।’’

এর পাশাপাশি, মণ্ডপের প্রবেশ-প্রস্থানের যে পদ্ধতি আগে মেনে চলা হত, তারও আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে পুরনো কমিটির সদস্যদের অভিযোগ। পুরনো কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, ‘‘অন্য বছর প্রতিমা এমন ভাবে রাখা হত, যাতে তার দু’পাশ দিয়ে দর্শনার্থীরা ভাগ হয়ে মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। ফলে মণ্ডপ খালি হত দ্রুত। এ বার কলকাতা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, যে বৃত্তাকার গ্রিল ঘেরা পথ দিয়ে (তার কিছুটা অংশ উড়ালপথ) দর্শকেরা মণ্ডপে ঢোকা থেকে বেরোনোর পথে পৌঁছেছেন, তার প্রস্থ মাত্র সাত ফুট সাত ইঞ্চি। চোরবাগানের মতো ভিড়ে ঠাসা মণ্ডপের পক্ষে যা অত্যন্ত অপরিসর এবং দর্শকদের মণ্ডপে ঢোকা থেকে বেরোনো পর্যন্ত সময় অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান কুণাল অগ্রবাল সোমবার জানান, গোটা মণ্ডপে মোটা ৩০টি সিসি ক্যামেরা ছিল। তার মধ্যে ঘটনাস্থলের ফুটেজ উঠে এসেছে ১৩টিতে। সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, বৃষ্টির কারণে প্রস্থানপথ ভিড়ে বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় ভুল ঘোষণা কে বা কারা করেছে, তা দেখা হচ্ছে। মণ্ডপ ভেঙে পড়ার কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি।

পুরনো কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী ছাড়াও প্রায় কলকাতা পুলিশের প্রায় ১০০ জন কর্মী মোতায়েন থকতেন অন্য বছর। কলকাতা পুলিশের বিগত কয়েক বছরের পুজোর কর্মী মোতায়েনের নথিও সেই দাবিকেই সমর্থন করে। তিন জন সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ জনের বাহিনী মোতায়েন করা হত এই পুজোয়। কলকাতা পুলিশ সূত্রে খবর, এ বছর প্রথমে এই পুজোর জন্য এক জন ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিকের নেতৃত্বে ২৫ জনের বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কলকাতা পুলিশের এক সহকারী কমিশনারের কথায়, ‘‘এই বন্দোবস্ত দেখে অবাকই হয়েছিলাম।’’ পুলিশ সূত্রেই খবর, এর পর আরও দু’বার মোতায়েন কর্মীর সংখ্যা পরিবর্তন করা হয়। তৃতীয়ার দিন যখন দর্শনার্থীদের ভিড় আছড়ে পড়ে চোরবাগানে, তখন নতুন বন্দোবস্ত হয়। এ বার দু’জন ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বে ১০০ জনের বাহিনী।

চতুর্থী থেকে তাঁরা দায়িত্ব নেন। তবে মজার বিষয় হল যে, দুই ডেপুটি কমিশনারই কলকাতা পুলিশে কাজ করছেন প্রথম বার এবং পুজো কখনওই সামলাননি। লালবাজার সূত্রে খবর, তার ফলে চতুর্থীর দিনে বাহিনী বৃদ্ধির পরেও, ভিড়ের চেহারা দেখে আগাম আন্দাজ করতে পারেননি আধিকারিকেরা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও করেননি।

ফলে হাজার হাজার দর্শনার্থী বিনা বাধায় অপরিসর গলিপথ হয়ে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছেন মণ্ডপের প্রবেশপথে। সেখানে ‘অপেশাদার’ বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা আটকাতে পারেননি জনস্রোত। অন্য দিকে, পুলিশ খুঁজছে, কে ওই ঘটনার সময় মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে গিয়েছে’ বলে ঘোষণা করে আতঙ্ক বাড়িয়েছিলেন। কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আরও একটা চরম অপেশাদার এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল। মিরাজউদ্দিনের অভিজ্ঞতা, ‘‘২০২২ সালেও এ রকম কঠিন অবস্থা তৈরি হয়েছিল। আমরা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে মণ্ডপের আলো নিবিয়ে দিয়েছিলাম। মাইকে ঘোষণা হয়েছিল বৈদ্যুতিন সমস্যার জন্য সাময়িক ভাবে মণ্ডপ বন্ধ রাখা হচ্ছে। পরে ভিড় কমলে আবার মণ্ডপ খুলে দেওয়া হয়’’। এলাকার এক বাসিন্দা যিনি এই ক্লাবের সঙ্গে একসময় যুক্ত ছিলেন, তাঁর কথায়, ‘‘উদ্যোক্তা, পুলিশ এবং বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, যা এ বার দেখা যায়নি।’’

আর সেই সমন্বয়ের অভাবের পিছনের কারণ ব্যাখ্যায় উক্ত তথ্যগুলো পর পর সাজালে কমিটি, নিরাপত্তারক্ষী এবং পুলিশ— ভিড় সামলানোর এই তিন গুরুত্বপূর্ণ অংশের অনভিজ্ঞতা এবং পেশাদারিত্বের অভাবই গোটা বিপর্যয়ের পিছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে।

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy