দুর্গাপুজোয় কি এ বার আর সরকারি অনুদান মিলবে? দেওয়া হলেও কত টাকা? কতগুলি পুজো কমিটিই বা পাবে সেই টাকা? আগামী সোমবার কলকাতার দুর্গাপুজো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের
আমলে প্রথম দুর্গাপুজো ঘিরে সেই কারণেই ওই বৈঠক নিয়ে নানা মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। জল্পনা আরও বেড়েছে পুজো ধরে ধরে পুলিশ অতীতে অনুদানের টাকা কোন খাতে খরচ করা হয়েছে, সেই হিসাব চাওয়ায়। পুলিশ সূত্রের খবর, এই হিসাব বিচার করেই ঠিক হবে, সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটি আদৌ অনুদানের টাকা পাবে কিনা।
পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে স্পষ্ট কিছু জানানো না হলেও জল্পনা চলছে, আগের মতো সব পুজো কমিটিকে এ বার অনুদান না-ও দেওয়া হতে পারে। দুর্গাপুজো উদ্যোক্তাদের সংগঠন ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর এক প্রতিনিধিদল মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরে এই জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। ওই প্রতিনিধিদলের সদস্যদের দাবি, নির্দিষ্ট একটি অঙ্ক ধরে তার নীচে যে সব পুজো কমিটির বাজেট থাকবে, অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত ছোট পুজো কমিটিকে কিছু অনুদান দিলেও দেওয়া হতে পারে।
পুলিশ সূত্রের খবর, প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে নির্দেশ এসেছে, একটি থানা এলাকায় যতগুলি দুর্গাপুজো কমিটি অনুদান পেয়েছে, সেগুলির তালিকা তৈরি করতে হবে। সেই কমিটি অতীতে যত ‘ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট’ (খরচের হিসাব) জমা দিয়েছে, সেগুলি নতুন করে পর্যালোচনা করে রিপোর্ট দিতে হবে। দেখা হবে, অতীতে যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা যথাযথ কিনা। গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিকে অনুদানের তালিকা থেকে বাদ তো দেওয়া হবেই, প্রয়োজনে পুলিশের মাধ্যমেও পদক্ষেপ করা হতে পারে।
২০১৮ সালে প্রথম পুজো কমিটিগুলিকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা হওয়ার পরেই বিষয়টি আদালতে গড়ায়। তাতে অবশ্য অনুদান বন্ধ হয়নি। তবে, কোন কোন খাতে সেই টাকা খরচ করা যাবে, তা বলে দেয় আদালত। খরচের হিসাব কোর্টে জমা দেওয়ার কথাও বলা হয়। কিন্তু অভিযোগ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুজো কমিটিগুলির কাছ থেকে খরচের যথাযথ হিসাব মেলেনি। গত বছর কলকাতা হাই কোর্ট জানিয়ে দেয়, যে সব পুজো কমিটি ‘ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট’ জমা দেয়নি, তাদের অনুদান দেওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে রাজ্যের রিপোর্টও তলব করে আদালত।
তার জবাবে তৎকালীন তৃণমূল সরকার জানিয়েছিল, ২০২৪ সালে পুজো কমিটিগুলিকে অনুদান বাবদ বরাদ্দ করা হয়েছে ৩৮৫ কোটি ৩৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। মোট ৪৫৩৩৬টি পুজো কমিটিকে টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই বছর (২০২৪ সাল) পুজোর অনুদান ছিল কমিটি-পিছু ৮৫ হাজার টাকা। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে পুজোর অনুদান ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করা হয়। সেই হিসাবে ওই বছরে রাজ্য সরকারের খরচ হয়েছে ৪৯৮ কোটি ৬৯ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। এর সঙ্গেই প্রতি বছর ‘কলকাতা শ্রী’, ‘বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মান’-এর মতো পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সেই সব খাতে ৫০ হাজার টাকা করে এক লক্ষ টাকা কমিটির অ্যাকাউন্টে ঢোকার পাশাপাশি ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ, ক্রেতা সুরক্ষা, নারী ও শিশু কল্যাণের মতো একাধিক দফতরের বিজ্ঞাপনের নামেও ঢালাও টাকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, মকুব করে দেওয়া হয়েছে সরকারি প্রায় সমস্ত ফি।
প্রাক্তন সরকারের দাবি ছিল, বুঝেই টাকা দেওয়া হচ্ছে। বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি জড়িত। যা বাংলার জিডিপি-র প্রায় পাঁচ শতাংশ। বাংলায় যদি ৪৫ হাজার পুজো হয়, তাতে মৃৎশিল্পী, ডেকরেটর্স, সব ধরনের লোক মিলিয়ে প্রতি পুজোয় অন্তত ৫০ জন করে লোক জড়িত থাকেন। অর্থাৎ, প্রায় ২০ থেকে ২৫ লক্ষ মানুষ সরাসরি পুজোর সহঙ্গে যুক্ত। তাঁদের পরিবার ধরলে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবনধারণের পথ তৈরি করে পুজো। এ বার কি এই একই যুক্তিতে খয়রাতি চলবে? প্রশ্ন ঘুরছে পুজো-মহলে।