কলকাতার পেটের মধ্যে এ যেন এক খণ্ড বাংলাদেশ। ২০০ বর্গমিটার এলাকার মধ্যে দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরেজি বা হিন্দি নয়, বাংলা অক্ষরের প্রাধান্য। একের পর এক রেস্তরাঁর নামও বাংলা সাহিত্য থেকে তুলে আনা। পথে ঘুরছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যেও বেশির ভাগই বাংলাদেশের নাগরিক। কেউ জরুরি কাজে এসেছেন, কেউ চিকিৎসা করিয়ে সরাসরি বাস ধরে দেশে ফেরার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বাসের টিকিট বুকিং কাউন্টারগুলিতেও যাঁরা বসে রয়েছেন, তাঁদের উচ্চারণে বাংলাদেশের টান স্পষ্ট। সে দেশের কোনও নাগরিক টিকিটের খোঁজ করতে ঢুকলেই বলা হচ্ছে, ‘‘আমাদের বাসা ও-পারেই, আপনার কোন জেলা?’’ তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে এর পরে বলা হচ্ছে, ‘‘এখানেই হোটেলে ছিলেন তো? পার্থক্য বুঝবেন না। এ-পারের এই তল্লাটে সবই ও-পারের মতোই। পুরো নিজের বাসায় আছেন মনে হয়!’’
‘নিজের বাসা’র অনুভূতি জাগানো, ধর্মতলা চত্বরের মির্জ়া গালিব স্ট্রিট, সদর স্ট্রিটের মতো এলাকাগুলি আতঙ্কের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশিদের মধ্যে। মঙ্গলবার রাতের অগ্নিকাণ্ডে ওই চত্বরের হোটেলে সাত বাংলাদেশির মৃত্যুর পরে অনেকেই সেখানকার হোটেলে উঠতে ভয় পাচ্ছেন।
কেউ কেউ ভিসার আবেদনের সময়ে এই চত্বরের যে হোটেলের ঠিকানা দিয়েছিলেন, সেটি ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আস্তানার খোঁজ শুরু করেছেন। দ্রুত টিকিট কেটে দেশে ফেরার তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে একাংশের মধ্যে। যার জেরে এই চত্বরের ব্যবসাও বড়সড় ধাক্কা খেতে পারে বলে জানাচ্ছেন এলাকার হোটেল, অতিথিশালা বা দোকানের লোকজন। তাঁদের কারও কারও দাবি, যুদ্ধ বা দু’দেশের সম্পর্কের অবনতির সময়ে যে মন্দা দেখা যায়, এই ঘটনায় খারাপ প্রভাব পড়তে চলেছে তার চেয়েও বেশি।
বৃহস্পতিবার যেমন এই চত্বরেই টিকিটের লাইনে দাঁড়ানো বাংলাদেশি নাগরিক রহমান ইসলাম বলছিলেন, ‘‘আগামী রবিবার ফেরার কথা ছিল। কম টাকায় ভাল থাকার জায়গার খোঁজে এখানকার একটি হোটেলে উঠেছিলাম। কিন্তু ভয়ে কাল সারা রাত ঘুম হয়নি। শুধু মনে হচ্ছে, আমাদের হোটেলেও এমন কিছু ঘটে যাবে না তো? তাই তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে ফিরে যাব ঠিক করেছি।’’
এই চত্বরেই দেখা গিয়েছে, পরিবার নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটছেন ঝিনাইদহের রেবা হোসেন। বললেন, ‘‘খুপরি হোটেলে উঠেছিলাম। ছোট ছোট ঘর। কোনও জানলা নেই। বললেই বলা হচ্ছে, পাশেই দমকল কেন্দ্র, কোনও ভয় নেই। কিন্তু কতটা নিরাপত্তা রয়েছে, সেটা দেখে নিয়েছি। টাকা বেশি লাগে লাগুক, ভাল হোটেল খুঁজতে বেরিয়েছি।’’
সদর স্ট্রিটের আর একটি হোটেলে ওঠা সোনালি সরকার আবার জানালেন, স্বামী হাসান কবীরের চিকিৎসার জন্য এ দেশে এসেছেন। সঙ্গে এসেছেন দুই আত্মীয়, কলকাতা ঘুরে দেখবেন বলে। বললেন, ‘‘শুধু চিকিৎসার জন্য এসে অতীতে ই এম বাইপাস সংলগ্ন একটি এলাকায় ছিলাম। এ বার ঘোরারও পরিকল্পনা আছে, তাই এখানে উঠেছি। কিন্তু এখন বাইপাসের কাছাকাছি কোনও হোটেলে চলে যাব। প্রাণ হাতে করে থাকা যাবে না।’’
ধর্মতলার এই চত্বরের হোটেল ব্যবসা ঘিরে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। পুলিশ সূত্রের খবর, মির্জ়া গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট-সহ এই এলাকার ৫০০ মিটারের মধ্যেই অন্তত হাজারটি এমন হোটেল রয়েছে, যেগুলির কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই। একাধিক বাড়ির এক-একটি তলে সাত-আটটি করে হোটেল, অতিথিশালা তৈরি করে ফেলা হয়েছে। সেগুলির উপরে নজরদারি চালানোর জন্য থানা থেকে নোডাল অফিসারও ঠিক করা আছে।
যাঁরা হোটেলে উঠছেন, প্রতিদিন তাঁদের পরিচয়পত্রের প্রতিলিপি থানায় জমা করার কথা। কিন্তু নিয়ম থাকলেও তা এই চত্বরে শুধু খাতায়-কলমেই থেকে যায় বলে অভিযোগ। অনিয়মটাই এই চত্বরের নিয়ম। এখানকার হোটেল ব্যবসায়ী শাহনাজ খান বললেন, ‘‘বাংলাদেশের নাগরিকদের উপরেই এই চত্বরের ব্যবসা দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁদের মৃত্যুর প্রভাব এ বার মনে হচ্ছে সুদূরপ্রসারী হবে।’’