রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন ১৯৪১ সালে, শ্রাবণ মাসের দুপুরবেলায়। আমি তখন গঙ্গার ওপর পন্টুন ব্রিজ পেরোচ্ছিলাম। গঙ্গার এপারে ওপারে হাওড়া আর কলকাতার খানিকটা জুড়ে ফুরফুরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। ইলশেগুঁড়ির ফাঁকে ফাঁকে রোদ্দুর ঝিকিয়ে উঠছিল, আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। ওইরকম রূপকথার আবহাওয়াতেই নাকি শেয়ালদের বিয়ে হয়। পরে ‘সময়হারা’ কবিতাটি পড়ে বুঝেছিলাম রবীন্দ্রনাথ যিনি মৃত্যুকে পরম এক বিয়ে বলেই ভাবতেন, ইচ্ছে করেই শেয়ালদের বিয়ের লগ্নকে নিজের মৃত্যুর লগ্ন বলে বেছে নিয়েছিলেন,” লিখেছেন মণীন্দ্র গুপ্ত। প্রতিবারই আমাদের মাঝে ‘বড়ো বেদনার মতো’ বেজে ওঠে, বাইশে শ্রাবণের সেই লগ্ন।
এ বছর সেই দিনটির স্মরণেই ‘দেবভাষা বই ও শিল্পের আবাস’ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে দু’টি বই। একটি আবর্তিত কবির আত্মপ্রতিকৃতি নিয়ে, শিল্প ঐতিহাসিক আর শিবকুমারের লেখায় রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রতিকৃতি: ছবিতে আত্মপরিচয় (ভাষান্তর: সংযম পাল); অন্যটি: শিল্প আলোচক সুশোভন অধিকারীর কলমে কবির ২৫টি ফোটোগ্রাফ নিয়ে বই, কবির আলোকচিত্র থেকে জীবনচিত্র। শিবকুমার লিখছেন, জানামতে ১৯৩২-এর ৫ মার্চ কবি প্রথম আত্মপ্রতিকৃতিটি আঁকেন, এবং ‘এটিতেই তিনি প্রথাগত প্রতিকৃতির সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলেন’। কবির মুখমণ্ডলে ছিল ‘অভ্রান্ত বিষণ্ণতা’, যার নেপথ্যে ১৯৩১-এর কথা মনে করান লেখক: ঔপনিবেশিক হিংসা, হিজলির গুলিচালনা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অস্থির করে তুলেছিল তাঁকে। ৬ সেপ্টেম্বর এ-প্রসঙ্গে হেমন্তবালা রায়কে কবি লিখছেন, “আমার বেদনাবহ নাড়ি এইরকম কোনো সংবাদের নাড়া খেয়ে যখন ঝনঝন করে ওঠে তখন সে যেন আর থামতে চায় না।” জার্মানিতে থাকা দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথকে নিয়েও শঙ্কিত তিনি, কারণ উঠতি ফ্যাসিজ়মের আবহ আর তার দুর্বল স্বাস্থ্য। প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি আঁকার পাঁচ মাস পর নীতীন্দ্রের মৃত্যু, আর লেখকের প্রশ্ন: তিনি কি নীতীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পূর্বাভাস অনুভব করেছিলেন? বই থেকে দু’টি ছবি, উপরে।
আলো এসে পড়ে দ্বিতীয় গ্রন্থটি থেকেও, যেখানে সুশোভন অধিকারী কবির আলোকচিত্র থেকে আমাদের নিয়ে যান তাঁর জীবনচিত্রে। যেমন, ১৯৩৭-এ সত্যেন্দ্রনাথ বিশীর ক্যামেরায় ধরা ছবিতে শান্তিনিকেতনে লেখার টেবিলে গম্ভীরমুখে ঝুঁকে পড়ে লিখছেন কবি, তখন কেমন ছিল তাঁর মনের অবস্থা? লেখক জানান, অসুস্থ শরীর ও মন নিয়ে জেলবন্দিদের জন্য কবির দৌড়াদৌড়ির অন্ত নেই। আন্দামানে তখন দ্বীপান্তরিত, স্বদেশি আন্দোলনরত বন্দিদের অনশন ধর্মঘট চলছে। অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের, অপরাধও তেমন গুরুতর নয়, ব্রিটিশ সরকারের রোষে লঘু পাপে গুরুদণ্ড ভোগ করছিলেন। রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পাঠালেন, “বঙ্গদেশ তাহার অনশন-ধর্মঘটী নির্বাসিত সন্তানদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানিবার জন্য ব্যাকুল। দেশ তোমাদের পশ্চাতে আছে।” ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ থেকে কবির নির্বাচিত ২৫টি আলোকচিত্র নিয়ে টোয়েন্টি ফাইভ পোর্ট্রেটস অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, সেই ছবিগুলি ধরেই এ-বইয়ে কবির তাৎকালিক জীবন উঠে এসেছে। দু’টি বইয়েরই সজ্জা শিল্পী কৃষ্ণেন্দু চাকীর।
মঞ্চে তিনি
বাংলা জনসংস্কৃতির পরিসরে বঙ্কিমচন্দ্রের চট্টোপাধ্যায় (ছবি) কীর্তিত নাম। তাঁর আনন্দমঠ স্বাধীনতার পর পরই চলচ্চিত্রে রূপ পায়: ১৯৫১-র কলকাতায় ভারতী-অরুণা-রূপবাণী সিনেমাহলে মুক্তি পায় সতীশ দাশগুপ্তের বাংলা ছবি, পরের বছরেই হেমেন গুপ্তের পরিচালনায় হিন্দি আনন্দমঠ: সত্যানন্দের চরিত্রে পৃথ্বীরাজ কপূর, মহেন্দ্র ভারতভূষণ। পেরিয়েছে অনেকটা সময়, একালের বাংলায় ‘বন্দে মাতরম্’ গানের নবমর্যাদা সূত্রে বঙ্কিম ও আনন্দমঠ ফের শিরোনামে, বাংলা থিয়েটারেও। ‘পূর্ব পশ্চিম’ নাট্যদল এর আগে তারাশঙ্কর বিভূতিভূষণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা রূপ দিয়েছে নাট্যে, বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রথম। সৌমিত্র মিত্রের প্রযোজনা পরিকল্পনায়, দেবাশিসের নির্দেশনায় আগামী ১২ অগস্ট সন্ধে সাড়ে ৬টায় অ্যাকাডেমি মঞ্চে আনন্দমঠ-এর প্রথম অভিনয়। নাট্যভাষা সমকালীন, সংলাপ বঙ্কিমী তথা সাধুভাষায়। পূর্ব পশ্চিম-এর কলাকুশলীদের সঙ্গে অভিনয়ে নির্দেশকের ‘মডার্ন অ্যাক্টিং কোর্স’-এর অভিনেতারাও।
মানুষের পাশে
দল বা গোষ্ঠীবিশেষের জন্য নয়, তাবৎ লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই মানুষী কথা পত্রিকার। গত দশ বছরে প্রকাশিত ৭৫টি সংখ্যা; পাশাপাশি চলেছে গ্রন্থপ্রকাশ, ২০১৭ থেকে নারী বিষয়ক বইয়ের গ্রন্থাগার ‘মানুষীর বইঘর’, আলোচনা। প্রতিষ্ঠাদিবস উদ্যাপন করবেন ওঁরা দক্ষিণ কলকাতার গৃহসহায়িকা বেবী দাসকে সম্মানিত করে। বেবী তাঁর এলাকায় ধর্মনিরপেক্ষ কর্মকাণ্ডের প্রধান মুখ, সমাজ ও রাজনীতি-সচেতন নাগরিক, গৃহসহায়িকাদের সংগঠন ও বয়স্ক শিক্ষাপ্রসারে ব্রতী। ৯ অগস্ট বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠান শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় রিসোর্স সেন্টারে, থাকবেন নব দত্ত রুশতী সেন প্রমুখ।
শতবর্ষ স্মরণে
১৯২৬-এ প্রায় সাত মাস ইউরোপ ভ্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। কবির এই সফর নিয়ে সেকালে দেশে-বিদেশে বিপুল চর্চা হয়। তবে ভ্রমণকালেও তাঁর গান রচনা থামেনি, জার্মানিতে এক মাস থাকাকালীন লেখেন ১৪টি গান। ইউরোপের অন্যান্য শহরেও আরও ১০টি গান লিখেছেন। কবির ইউরোপ ভ্রমণের শতবর্ষ চলছে, এই উপলক্ষে লন্ডনের সঙ্গীত সংগঠন ‘গীতবীণা’ পশ্চিমবঙ্গে এসেছে একাধিক অনুষ্ঠান নিয়ে। গত ৬ অগস্ট শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কবির ইউরোপে রচিত গানগুলি পরিবেশন করলেন ওঁরা, আর আগামী কাল রবিবার, কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে সন্ধে সাড়ে ৬টায় ওঁদের নিবেদন গীতি-আলেখ্য, ‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে’; পীতম সেনগুপ্তের পরিকল্পনা ও বিন্যাসে।
তিন দশকে
স্কুল-কলেজের এক ঝাঁক পড়ুয়া যোগ দিয়েছে অভিধান রচনার কাজে। শুভেন্দু মজুমদারের নেতৃত্বে বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তালিকা তৈরি করেছে চার বছর ধরে, তৈরি হয়েছে অগ্নিযুগের অভিধান (প্রকা: র্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন)। কয়েক হাজার বাঙালি বিপ্লবীর তথ্যে ঋদ্ধ অভিধানের নব সংস্করণ প্রকাশ পাবে অহর্নিশ পত্রিকার ত্রিশ বছর উদ্যাপন অনুষ্ঠানে। তিন দশকে অশোকনগরের এই পত্রিকার বুদ্ধদেব বসু নরেশ গুহ সত্যপ্রিয় ঘোষ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত নবনীতা দেব সেন সংখ্যাগুলি পাঠকপ্রিয় হয়েছে, শহরে হয়েছে নানা সভা-অনুষ্ঠান। কোভিডকালে তৈরি হয়েছে গ্রন্থাগার, মুখপত্র দ্রুহিণ-ও। সল্টলেকে অন্য থিয়েটার ভবনের জীবনস্মৃতি সভাকক্ষে ৯ অগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টায় বই-পত্রিকা প্রকাশ ও আলোচনা। দেশভক্তির গান শোনাবে অহর্নিশের গানের দল।
প্রতিনিধি
অস্থির যে সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা, সমাজ-রাজনীতি যে ভাবে বিপন্ন সারা দেশে, শেক্সপিয়ার রোজ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন আমাদের সাংস্কৃতিক যাপনে: এমনই মনে করেন কৌশিক সেন। তাঁর নাট্যদল ‘স্বপ্নসন্ধানী’ তাই জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনে ইতিমধ্যেই মঞ্চায়িত তাদের শেক্সপিয়ার-নাট্য উপস্থাপন করবে ১০ ও ১১ অগস্ট সন্ধ্যায় অ্যাকাডেমি মঞ্চে, অভিনীত হবে ম্যাকবেথ (৭টা) ও হ্যামলেট (৬টা)। নির্দেশক কৌশিক, বললেন: “ডেনমার্কের রাজপুত্র যে চিন্তায় দ্বিধাদীর্ণ, অন্যদিকে রাজা ম্যাকবেথ যে কিছুই ভাবে না... দু’জনেই এক নিষ্ঠুর সময়ের প্রতিনিধি।” ১৯৯২-এর মে মাসে জন্মানো নাট্যদলটির শ্যামল সেন স্মৃতি সম্মান এবার পাচ্ছেন রাজু ধর কৃষ্ণেন্দু সাহা মেরী আচার্য মহম্মদ আলি।
রবীন্দ্রব্রতী
তাঁর পিতামহ রবীন্দ্রনাথের সহযোগী, পিতা কলাভবনের প্রথম যুগের ছাত্র। সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পড়তে যান শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত। সহপাঠী মহাশ্বেতা দেবী অমিতাভ চৌধুরী, কয়েক ক্লাস উপরে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় অরুন্ধতী দেবী সত্যজিৎ রায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের পাঠ, পড়েছেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সুকুমার সেনের কাছে। ১৯৫৭-য় যোগ দেন বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগে, অবসর ১৯৯১-এ। লিখেছেন বাংলার বাউল: কাব্য ও দর্শন, রবীন্দ্র চিত্রকলা: রবীন্দ্র সাহিত্যের পটভূমিকা, শিল্পী রামকিঙ্কর: আলাপচারি-র মতো বই; রবীন্দ্র-সাহিত্য, দর্শন ও চিত্রকলার প্রচার-প্রসারই ছিল ব্রত। প্রয়াত ২০২২-এ, এ বছর ওঁর জন্মশতবর্ষ। জীবনস্মৃতি আর্কাইভ-এর উদ্যোগে সল্টলেকে অন্য থিয়েটার ভবনে আজ বিকেল ৫টায় ওঁর লেখা বই ও আঁকা ছবির প্রদর্শনী (ছবি), ‘রবীন্দ্রভাবুক সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়’ প্রসঙ্গে বলবেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়।
ইতিহাস ছুঁয়ে
৮ অগস্ট তারিখটি ঐতিহাসিক, ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সূচনালগ্ন। ১৯৪২-এর এই দিনে কংগ্রেসের বম্বে অধিবেশনে ঘোষণা, ৯ অগস্ট জনজাগরণ ও ব্রিটিশের দমনপীড়ন বিধৃত ইতিহাসে। তারই স্মরণে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর অনুষ্ঠান আগামী কাল রবিবার সন্ধে ৬টায়, নেতাজি ভবনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন কেমন ছিল, আর্কাইভাল ফুটেজে দেখানো হবে তা। বাংলা ও বিশেষত মেদিনীপুরের প্রেক্ষিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রসঙ্গে বলবেন সুগত বসু; কলকাতায় এই আন্দোলন বিষয়ে শিশিরকুমার বসুর লেখা থেকে পড়বেন সুমন্ত্র বসু। নেতাজি সুভাষচন্দ্রের অসমাপ্ত আত্মজীবনী অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম-এর বঙ্গানুবাদ ভারত পথিক বেরোবে নব সংস্করণে, ইংরেজি বই নেতাজি মিউজ়িয়ম-ও। মনস্বিতা ঠাকুর গাইবেন দেশাত্মবোধক গান। ছবিতে মকবুল ফিদা হুসেনের চিত্রকৃতিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলন।
প্রবর্তক
লব্ধযশ চিত্রশিল্পী; মঞ্চসজ্জা ও ফোটোগ্রাফির পরিসরেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন ডেভিড হকনি (১৯৩৭-২০২৬)। ষাটের দশকের পপ আন্দোলনের শেষ ‘মোহিকান’ তিনি। বাস্তবাভিমুখী চিত্রকলায়, বিশেষত প্রাকৃতিক দৃশ্যায়নে নবধারার প্রবর্তন করেছেন, বিশ্ববন্দিত যা। প্রয়াত হয়েছেন গত ১১ জুন লন্ডনে— তাঁকে স্মরণ করবে কলকাতা কন্টেম্পোরারি আর্টিস্টস গ্রুপ (কেসিএজি) ‘অ্যান ইভনিং উইথ ডেভিড হকনি অ্যান্ড হিজ় আর্ট ওয়ার্ল্ড’ অনুষ্ঠানে, আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকুরিয়া শহিদনগরের নান্দীমুখ সংস্কৃতি কেন্দ্রে। বিশ্ব ও ভারতের চিত্রকলার প্রেক্ষিতে তাঁর অবদান, তাঁর ল্যান্ডস্কেপ-চিত্র, বিদেশে তাঁর প্রদর্শনী নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনায় মৃণাল ঘোষ দেবাশিস চন্দ ও পিউ মহাপাত্র, কথাসমন্বয়ে সঞ্জয় ঘোষ। উদ্বোধনে সমীর আইচ অমিতাভ ধর ও প্রদীপ রক্ষিত।