E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বিপর্যয়ের দু’মাস পরেও নিখোঁজ, উত্তর হাতড়াচ্ছে পরিবারগুলি

গত ২৬ অগস্ট সকালে নেপালের ভোটেকোশি নদীর হড়পা বানে তলিয়ে যায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বহু এলাকা। কাদাজলের স্রোত পাহাড় থেকে নেমে এসে মূহূর্তে ধূলিসাৎ করে দেয় একের পর এক গ্রাম। জলের তোড়ের হাত থেকে রেহাই পাননি এই এলাকার বাসিন্দা এবং পর্যটকেরা।

চন্দন বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৩৪

— ফাইল চিত্র।

নেপাল বিপর্যয়ের পরে কাটল দু’মাস। কিন্তু সেই বিপর্যয়ে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর এখনও দেওয়া হয়নি বছর বিরাশির বৃদ্ধা মাকে। আপাতত বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে। নেতাজিনগরের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো করতেন রিনা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিই ছিলেন অন্যতম উৎসাহী। কিন্তু পুজোর সেই মূল উদ্যোক্তাই বেড়াতে গিয়ে আর বাড়ি না ফেরায় এ বছর লক্ষ্মীপুজোর কোনও আয়োজনই হল না তাঁর বাড়িতে। একই অবস্থা পাটুলির বাসিন্দা নিখোঁজ অমরনাথ পালের পরিবারেও। লক্ষ্মীপুজোর আনন্দ ফিকে হয়ে গিয়েছে অমরনাথের মেয়ের কাছে। বরং নিকটজনের ফিরে আসার অলীক আশা ছেড়ে এর পরে কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে নেপাল-বিপর্যয়ে নিখোঁজদের পরিবার।

গত ২৬ অগস্ট সকালে নেপালের ভোটেকোশি নদীর হড়পা বানে তলিয়ে যায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বহু এলাকা। কাদাজলের স্রোত পাহাড় থেকে নেমে এসে মূহূর্তে ধূলিসাৎ করে দেয় একের পর এক গ্রাম। জলের তোড়ের হাত থেকে রেহাই পাননি এই এলাকার বাসিন্দা এবং পর্যটকেরা। সেই ভয়াবহবিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য মিলেছে। দু’মাস পরেও খোঁজ নেই প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের! নিখোঁজের তালিকায় বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সঙ্গে নাম রয়েছে এ রাজ্যের পর্যটকদেরও। নেপালে বেড়াতে গিয়ে ওই বিপর্যয়ের ধাক্কায় আর ফিরে আসেননি এ রাজ্যের ৩৭ জন।তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কলকাতার বাসিন্দাই চার জন।

সেই ৩৭ জন নিখোঁজদের তালিকায় আছেন নেতাজিনগরের বাসিন্দা রিনা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত অগস্টে কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে মানস সরোবর বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ঘরে ফেরা হয়নি। ‘ফেরার আশা নেই’ মেনে নিয়েও সে কথা রিনার মাকে আজও জানাতে পারেননি পরিবারের বাকি সদস্যেরা।

রিনার দিদি গুঞ্জা মুখোপাধ্যায় জানালেন, ‘‘মায়ের বয়স ৮২ বছর। ঠিক মতো চলাফেরাও করতে পারেন না। বার্ধক্যজনিত নানা রোগ রয়েছে। এই অবস্থায় তাঁকে কী বলব?’’ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন গুঞ্জা। এর পরে তিনি বলেন, ‘‘মাকে বোনের কথা মিথ্যে বলেছি। বোন পড়াতে ভালবাসে, মা জানেন। তাই মাকে বলেছি, নেপালের একটি অনাথ আশ্রমে বোন পড়াচ্ছে।’’ নিখোঁজ পরিবারের সদস্যকে ছাড়া গোটা পরিবারের কাছে এ বারের দুর্গাপুজো ছিল অর্থহীন। এমনকি, প্রতিবারের মতো এ বার বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোও হয়নি। গুঞ্জার কথায়, ‘‘বাজার করা থেকে শুরু করে পুজোর বাকি সাজগোজ, সবই ছিল বোনের দায়িত্বে। ও তো নেই, কে করবে?’’

একই অবস্থা পাটুলির অমরনাথ পালের পরিবারেরও। প্রতিবার ঘরোয়া ভাবে লক্ষ্মীপুজো হত ওই বাড়িতে। এ বার সেটুকুও হয়নি বলে জানালেন অমরনাথের মেয়ে রূপমা পাল। পুজো, উৎসবের আনন্দ কিছুই এ বার ছুঁতে পারেনি ওই পরিবারকে। উল্টে গোটা পরিবারটাই নানা প্রশ্নেরউত্তর হাতড়ে বেড়াচ্ছে। এ দিন রূপমা জানালেন, অমরনাথ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী ছিলেন, পেনশন পেতেন। এর জন্য প্রতি বছর নভেম্বরে নানা কাগজপত্র ব্যাঙ্ক-সহ বিভিন্ন জায়গায় জমা করতে হয়। ওই তরুণীর কথায়, ‘‘জানি না এবছর কী হবে। আসলে আমরা তো এটাও জানি না, বাবা বেঁচে আছেন, নাকি জলের স্রোতে তলিয়ে গিয়েছেন।’’

সম্প্রতি নেপাল সরকারের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে, নেপাল বিপর্যয়ের জেরে ৪৫ দিনেরও বেশি সময়ে ধরে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের মৃত্যুর শংসাপত্র দেওয়া হবে।এই ঘোষণার ফলে দু’মাস ধরে চলা আইনি জটিলতা কাটবে বলে আশা করেছিল এ রাজ্যের এবং কলকাতার নিখোঁজদের পরিবারগুলি। অনেকে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার পরে কিছু দিন কাটলেও রাজ্য প্রশাসনের তরফে নতুন করে কোনও বার্তা না আসায় ফের অন্ধকারে পরিবারগুলি।

নেপাল সরকারের ওই ঘোষণার পরে পর্ণশ্রীর বাসিন্দা, নিখোঁজরণজিৎকুমার হাওলাদারের পরিবার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনও উত্তর পাননি বলে জানালেন রণজিতের মেয়ে সুনন্দা। তিনি বললেন, ‘‘এখন তো আর আমাদের হাতে কিছু নেই। আপাতত পাওয়ার আশা বলতে মৃত্যুর শংসাপত্র। নেপাল সরকারের ঘোষণার পরে সে বিষয়ে জানতে পুজোর মধ্যে, এমনকি পুজোর পরেও যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু শুধু বলা হচ্ছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। তাঁরা বিষয়টা দেখছেন।’’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Flash flood Nepal

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy