ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের প্রক্রিয়ায় (এসআইআর) যে ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’র কথা বলেছিল নির্বাচন কমিশন, তাকেই নিশানা করলেন দেশের প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা। ‘সিটিজেন্স ফোরাম’ আয়োজিত নাগরিক কনভেনশন থেকে ওই বার্তা দেওয়ার সঙ্গেই লাভাসার মত, ‘অসঙ্গতি’ থাকলেও, কেউ ভোটদানের অযোগ্য, এমনটা নয়।
আয়োজকেরা জানিয়েছেন, কলামন্দিরে কনভেনশনের জন্য টাকা দেওয়া হলেও, তা ‘প্রযুক্তিগত ত্রুটি’র কথা বলে বাতিল করা হয়েছে। শেষমেশ মঙ্গলবার ‘বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সংস্কৃতি কেন্দ্রে’র (বিবিসিসিআর) খোলা মাঠে আয়োজিত ওই সভায় ভিডিয়ো-বার্তা দিয়েছেন লাভাসা, অভিনেতা প্রকাশ রাজ। ছিলেন জহর সরকার, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, অশোকনাথ বসু, অনিতা অগ্নিহোত্রী, অপর্ণা ভট্টাচার্য। সঞ্চালনায় ছিলেন সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। লাভাসা বলেছেন, “নির্বাচন কমিশন যে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, সেটা আদতে কী? মাপকাঠি কী? পুরোটাই বিভ্রান্তিকর, অস্বচ্ছ। কারও কোনও অসঙ্গতি থাকলেও, তিনি ভোটদানের অযোগ্য, এমনটা নয়।” কমিশন যে এসআইআর চালিয়েছে, তাকে নিশানা করে লাভাসার ক্ষোভ, “এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অভূতপূর্ব। কমিশনের গৃহীত সিদ্ধান্ত আসলে মানুষকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।”
ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন ভোটার তালিকা যাতে যথাযথ ভাবে তৈরি হয়, সে জন্য দেড় বছর ধরে গোটা দেশ ঘুরেছিলেন— এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করেছেন লাভাসা। তাঁর অভিযোগ, “কমিশনের অগ্রাধিকার যেন অযোগ্য বলে বিবেচিত মানুষদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।” তাঁর সংযোজন, “পশ্চিমবঙ্গে খসড়া ভোটার তালিকা তৈরি হওয়ার সময় ৬০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে ‘বিবেচনাধীন’ বলা হল। কিন্তু কমিশন জানত, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারে সামনে। ৬০ লক্ষ মানুষের আবেদনের নিষ্পত্তি করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, সময় নেই।” একই সঙ্গে, ট্রাইবুনালে এখন যে আবেদনগুলির নিষ্পত্তি হচ্ছে, তার ৯৩% ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্টেরা ‘প্রকৃত ভোটার’। ফর্ম-৬ পরিবর্তন, নির্বাচন কমিশনের সফ্টঅয়্যার-সহ নানা বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লাভাসা।
এই প্রেক্ষিতে বিজেপি ও কমিশনের একাংশের ‘আঁতাঁতে’র অভিযোগ তুলেছেন অভিনেতা প্রকাশ। তাঁর অভিযোগ, “নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের জমানা কমিশনকে ব্যবহার করেছে। এসআইআর প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক পদ্ধতি, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শেষ করতে চাইছে।”
কনভেনশন থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, সাংবিধানিক ন্যায়-বিচার, মানুষের অধিকার রক্ষার ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন আমলা জহরের অভিযোগ, “১৩-১৪ লক্ষ ভুয়ো ফর্ম-৭ কম্পিউটারে তৈরি করা হয়েছে। কম্পিউটার ব্যবস্থাপনা দু’জন ব্যক্তি জানতেন—জ্ঞানেশ এবং তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের ডিজি সীমা খন্না।” আর বিকাশ বলেছেন, “মানুষের প্রথম অধিকার রাজনৈতিক ন্যায়, যার মূল কথা প্রত্যেক ভোটারের একটি করে ভোটের সমান মূল্য। মোদী বুঝলেন, মানুষের সমর্থন বেশি দিন থাকবে না, তাই প্রান্তিক মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা।”