২০০৯। রেলমন্ত্রী হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কয়েক মাসের মধ্যে তৈরি হল কিছু বিশেষজ্ঞ কমিটি। জায়গা পেলেন শিল্প-সংস্কৃতি জগতের বড় বড় সব নাম।
তালিকা দীর্ঘ—থিয়েটারের শাঁওলি মিত্র, বিভাস চক্রবর্তী, ব্রাত্য বসু, অর্পিতা ঘোষ, সাহিত্যিক জয় গোস্বামী, চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, শুভাপ্রসন্ন, সমীর আইচ, গায়ক দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, পল্লব কীর্তনীয়া, চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ ও হরনাথ চক্রবর্তী, অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবী, নৃত্যশিল্পী অমলাশঙ্কর।
দু’বছর পরে রাজ্যের ক্ষমতায় এসে আর কমিটিতেই থেমে থাকলেন না। নতুন আকাদেমিও বানালেন। বাম আমল থেকেই রাজ্যে ছিল বাংলা আকাদেমি, নাট্য আকাদেমি, সঙ্গীত আকাদেমি ও চারুকলা পর্ষদ। মমতা তৈরি করলেন আলাদা নজরুল আকাদেমি, কবিতা আকাদেমি, বিদ্যাসাগর আকাদেমি, দলিত সাহিত্য আকাদেমি। নানান দায়িত্ব পেলেন আরও অনেকে।
ক্রমে, শিল্প-সংস্কৃতি খাতে সরকারি বিনিয়োগের প্রশ্নে দেশের অন্যতম পুরোধা রাজ্য হয়ে দাঁড়াল পশ্চিমবঙ্গ। সরকারি অনুষ্ঠান মানেই সঙ্গে কোনও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। ২০১১-’১২ থেকে ২০২৪-’২৫-এর মধ্যে শিক্ষা, ক্রীড়া ও শিল্প-সংস্কৃতি খাতে রাজ্যের বাজেট পাঁচ গুণ বাড়ে; যে সময়ে এই খাতে কেন্দ্রীয় বাজেট বেড়েছিল তিন গুণ।
এরই মাঝে ঘটে গেল আরেক আবির্ভাব। নানা রকম লেখক-শিল্পীর সান্নিধ্যে এসে মমতার বহুমুখী সৃষ্টিশীল প্রতিভার প্রকাশ্য প্রকাশ। ২০০৬-এর আগে শিল্প-সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সংশ্রবের খবর ছিল না। কিন্তু ২০১২-’১৩-র মধ্যেই বইমেলা থেকে চলচ্চিত্র উৎসব, সবেতেই মধ্যমণি তিনি।
কখনও শিল্প-সংস্কৃতি জগতের কারও অসুস্থতা, আর্থিক অনটন বা অন্য কোনও গুরুতর বিপদের কথা জানতে পারলেই কোন রং না-দেখে নিজে উদ্যোগী হয়ে সরকারি তরফে সাহায্যের ব্যবস্থা করতেন মমতা। কবি জয় গোস্বামী মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা অকুণ্ঠচিত্তে প্রকাশ করেছেন। তবে উপকৃতের সংখ্যা নেহাত কম নয়।
আইকন আত্মসাৎ করার কাজেও মমতার জুড়ি কম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বুদ্ধদেব-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল-সমালোচকদের মৃত্যুর পরে শেষযাত্রার দখল কার্যত নিয়ে নেন মমতা।
বাম আমলে রবীন্দ্রসদনে দেহ রাখা, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সরকারি শোকবার্তা প্রকাশের মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় বা সরকারি স্তরের সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হত। কিন্তু মমতা শুরু করেন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, গান স্যালুট-সহ শেষ বিদায়। মহাশ্বেতা, সৌমিত্রদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়। মৃণাল সেন, শঙ্খ ঘোষদের পরিবার আপত্তি না-করলে তাঁদের শেষকৃত্যও হত পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, গান স্যালুট-সহ। মমতা সেটাই চেয়েছিলেন।
কিন্তু শঙ্খ যে তৃণমূলের হিংসা নিয়ে অত তীক্ষ্ণ বিদ্রুপের কবিতা লিখলেন? মৃণাল, সৌমিত্র যে অভিযোগ করেছিলেন, মমতার আমলে চলচ্চিত্র উৎসব সার্কাসে পরিণত হয়েছে?
তাতে কী? বড় আইকন আত্মসাৎ করতে গেলে ও সব ভুলে যেতে হয়, মমতা জানতেন। বরং, উদারতা দেখানো যাবে। আরও বেশি করে দেখানো যাবে, তিনিই সংস্কৃতি জগতের অভিভাবক। এমনকি সমালোচকদেরও মাথায় তুলে রাখেন।
এই যে মমতা বামবৃত্তের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের এত পরিসর দিলেন, এর মধ্যে দিয়ে তিনি অন্তত তিনটি উদ্দেশ্য সাধন করেন।
অভিনেতা জয়রাজ ভট্টাচার্য মনে করেন, সাংস্কৃতিক বামদের দিয়ে আসলে রাজনৈতিক বামেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমাতে চেয়েছিলেন মমতা। তাঁর মতে, মমতা সরকারে আসার পর প্রাথমিক ভাবে মূল বিরোধী ছিল বামফ্রন্টই। তাঁরা যাতে কোনও ভাবেই সরকারকে বিপদে ফেলার মতো শক্তিশালী না-হয়ে উঠতে পারেন, তাই মমতা এঁদের ব্যবহার করলেন জনমানসে বামফ্রন্ট সংক্রান্ত বিরূপ ধারণা জিইয়ে রাখতে।
আবার জয়পুরিয়া কলেজের অধ্যাপক ও লেখক অর্ণব সাহা মনে করেন, সাংস্কৃতিক জগতের এই সব ব্যক্তিত্বকে মমতা ব্যবহার করতেন দলের এক প্রগতিশীল, শিল্প-সংস্কৃতিমুখী রূপ তৈরি করে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে। “যাঁরা দলের সঙ্গে থাকতেন, তাঁরা বছরভর নানা সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পেতেন। যাঁরা থাকতেন না, অনেক সময় সমস্যায় পড়তেন,” বলেন অর্ণব।
এই সব অঙ্কের বাইরেও আরেক রসায়ন সম্ভবত ছিল। সেটা হল সংস্কৃতি জগতে ‘জাতে ওঠা’র আকাঙ্ক্ষা। নব্বইয়ের দশকে তাঁর উত্থানের সময় অনেক তথাকথিত প্রগতিশীল সিপিএম নেতা-কর্মী-সমর্থকও আড়ালে মমতাকে ‘ঝি ক্লাস’ বলে উল্লেখ করতেন। বাস্তবে, ‘ভদ্রলোক সমাজে’র বাইরে থেকেই তাঁর উত্থান। কোনও মামা, মেসো, আর্থিক সংস্থান বা নান্দনিক সংস্পর্শ ছাড়াই। লেখার আগ্রহ তাঁর বরাবরই ছিল। বই বেরোচ্ছে নব্বইয়ের দশক থেকেই। কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে তাঁর সঙ্গে থিয়েটার, সঙ্গীত, সাহিত্য জগতের রথী-মহারথীদের যোগাযোগ বাড়লে তিনিও তাঁদের এক জন হয়ে উঠতে চান।
মমতা বারবার নিজেকে এলিট-বিরোধী হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নিজেকেও সেই এলিট জগতের অংশ, বা মধ্যমণি, হিসেবে দেখতে তিনি যারপরনাই কাতর ছিলেন।
শুভাপ্রসন্ন হয়তো বলে দিলেন, তাঁর তুলির টানে প্রতিভা দেখতে পাচ্ছেন। উনিও অন্যদের জানিয়ে দিলেন, “জানো, শুভাদা বলেছে…”। তাঁর ‘বোল্ড ব্রাশ স্ট্রোকস’ বা তুলির বলিষ্ঠ টান তাঁর ছবিকে জীবন্ত করে তোলে, বলেন যোগেন। এই সব শুনে দ্বিগুণ উৎসাহে আঁকাআঁকি শুরু করেন মমতা। ছবি বেচে দল চালানোর টাকা তোলার কথা বলে দিলেন। মধুসন্ধানীরা কিনল সে-সব ছবি।
সে ভাবেই তাঁর গান লেখা ও সুরারোপের দক্ষতা নিয়ে বাহবা এল ইন্দ্রনীল সেনের থেকে। আলব্যাম বেরোল। নামী শিল্পীরা গাইলেন। ধারাবাহিকে ব্যবহার হল তাঁর লেখা ও সুর দেওয়া গান। সুবোধ সরকার, আবুল বাশারেরা জনগণকে বোঝালেন তাঁর ছড়ার সাহিত্যমূল্য। বাংলা আকাদেমির তরফে মন্ত্রী ব্রাত্য বসু তাঁকে ‘নিরলস সাহিত্য সাধনা’ ও ‘কবিতাবিতান’ নামক কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যজগতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ ত্রিবার্ষিক পুরস্কারটাই দিয়েদিলেন।
এই যে মমতা ঢালাও স্বীকৃতি দিলেন ও নিলেন, সেই ঘনিষ্ঠ রসায়নের ফল কী হল? নাগরিক সমাজ বাম আমলে নানা বিষয়ে প্রতিবাদে সরব হয়েছিল, তৃণমূল আমলে তা উধাও হয়ে গেল। এঁদের অনেকেই প্রথমে মূলত মমতা সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির কারণে ও পরে বিজেপির ‘সাম্প্রদায়িক-ফ্যাসিবাদী রাজনীতির’ বিরোধিতার উদ্দেশ্য দেখিয়ে মমতার প্রতি তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করতেন।
নাগরিক সমাজ, বিশেষত বাম-সাংস্কৃতিক বুদ্ধিজীবীরা, সাধারণত প্রতিষ্ঠানবিরোধী হন। এখানে তাঁরাও বৃহত্তর প্রতিষ্ঠানের অংশ হয়ে গেলেন। নতুন কোনও শক্তিশালী নাগরিক সমাজও আর গড়ে ওঠেনি।
যোগেনকে এক ডাকে গোটা দেশের শিল্পমহল চেনে। অথচ নির্বাচনী হিংসা বা গণহারে চাকরি চুরি, সবেতেই চুপ রইলেন তিনি। বাম আমলে তসলিমা নাসরিন কলকাতা-ছাড়া হওয়ার প্রতিবাদে প্রতুল গান বাঁধলেন, ‘হায় হায় হায়, ক্যা শরম কী বাত, মার্ক্সবাদী পার্টি ভি নাচে মৌলবাদ কে সাথ।’ কিন্তু তৃণমূল আমলে যখন তসলিমার বই প্রকাশ বা তাঁর লেখা সিরিয়ালের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেল, প্রতুল আর নতুন গান বাঁধলেন না। চিটফান্ড নিয়ে ‘যা গেছে তা যাক’ গান বাঁধা সুমন পরবর্তী কালে ‘খাও, খাও, খাও’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আর কিছু গাইলেন না।
তসলিমা যখন শেষ পর্যন্ত সঙ্ঘ পরিবারের হাত ধরে কলকাতায় এলেন, তিনি মঞ্চে ডেকে নিলেন জয়কেও। কিন্তু দর্শকাসন থেকে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ এই কবির মঞ্চে ওঠা নিয়ে প্রবল প্রতিবাদ হলে জয় নেমে আসেন। পরে বলেন, তৃণমূল আমলে বাংলায় সাহিত্য জগতে ‘থ্রেট কালচার’-এর প্রভাব শুরু হয়েছিল। ওই থ্রেট কালচারের কারণেই নাকি তিনি ২০২৩ সালে লেখা থেকে অবসর নেন।
রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত জীবিত কবিকে থ্রেট কালচারের জন্য লেখা থেকে অবসর নিতে হচ্ছে, এই একটি কথাই কি অনেক গল্প বলে না?
বাংলার সমাজজীবনে এই বুদ্ধিজীবী-বিদ্বজ্জন শ্রেণির যে প্রভাব ছিল প্রাক-তৃণমূল সময়ে, তা আজ অনেক ক্ষীণ। যে কারণে, ২০১১-র পরিবর্তনের সঙ্গে ২০২৬-এর পরিবর্তনের এক বিরাট পার্থক্য আছে—প্রথমটি হয়েছিল এঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণে; দ্বিতীয়টি হয়েছে তাঁদের বড় অংশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিরোধিতা সত্ত্বেও।