প্রকৃতির সম্পদ। জঙ্গলবাসী সন্তানদের জন্য প্রকৃতি সে সম্পদ উজাড় করে দেয় শরতে। কাজের জোগাড় না থাকলেও তাঁদের খাবারের জোগাড় হয়। কিছুটা বিক্রি করে ঘরে অর্থ আসে। কিন্তু প্রকৃতির সেই সম্পদে ফড়েদের থাবা বসছে। তাতে বাড়ছে দুর্গা ছাতু বা কাড়ান ছাতুর দাম। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে জঙ্গলমহলের বাসিন্দাদের। আবার ফড়েদের কারণে অনেকে সরাসরি বাজারে বিক্রি করতেও পারছেন না। দুর্গা ছাতু পাঠানো হচ্ছে পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডেও।
জঙ্গলমহলের খাদ্য সংস্কৃতিতে দুর্গা ছাতুর উল্লেখযোগ্য অবস্থান। স্থানীয়েরা দুগ্গা ছাতুও বলেন। মূলত আশ্বিন মাসে শাল-পিয়ালের জঙ্গলের বৃষ্টিধোয়া স্যাঁতসেঁতে মাটিয়ে হাজারে হাজারে ফোটে। রাঢ় বাংলার পাশাপাশি, সীমানা লাগোয়া ওড়িশা-ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলমহলেও কাড়ান ছাতু অসম্ভব জনপ্রিয়। দেবী দুর্গার আগমনের আগে ছত্রাক বা ছাতুটি হয় বলে ‘দুগ্গাছাতু’ নাম। আবার পুজোপার্বণের সময়ে ফোটার কারণে অনেকে ‘পরব ছাতু’ও বলেন। সাদা গা, হালকা বাদামি পাড়ের ঘের দেওয়া ছাতার মতো দেখতে ছাতুটি খুঁজে খুঁজে ’কুড়িয়ে আনা’ হয়। তাই আঞ্চলিক ভাষায় ‘কাড়ান’ (কুড়ানো) নাম পেয়েছে।
রাধাষ্টমীর দিন থেকেই কাড়ান ছাতুর জোগান বাড়ে। চলে দুর্গা পুজো পর্যন্ত। জঙ্গলমহলের স্থানীয় সাহিত্যে কাড়ান ছাতুর প্রশংসার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু নিজস্ব সম্পদ কিনতে গিয়ে হাত পুড়ছে জঙ্গলমহলের বাসিন্দাদেরও। ঝাড়গ্রাম শহরের বাসিন্দা আকাশ সিংহ বলেন, ‘‘বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে ছাতুটি একবার পাওয়া যায়। দাম থাকুক না কেন এটা কটা দিন মাছ ও মাংসের বদলে ছাতু খাই।’’ আর্থ-সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে কাড়ান ছাতুর। শরৎকালে চাষের কাজ না থাকায় জঙ্গলমহলের গ্রামাঞ্চলে খেতমজুর পরিবারগুলির সংসারে টান পড়ে। সে সময় অতিথি এলে জঙ্গলের ছাতু দিয়ে দরিদ্র গৃহস্থের মান রক্ষা হয়। কারণ খেতে সুস্বাদু। এই সময় দরিদ্র আদিবাসী-মূলবাসীরা কাড়ান ছাতু সংগ্রহ করে বাড়তি আয়ও করেন। ভোরের আলো ফোটার আগে জঙ্গলে ছাতু তুলতে যান। এ জন্য বিপদেও পড়তে হয় তাঁদের। সাপ, বিষাক্ত পোকা ছাড়াও হাতির ভয়ও রয়েছে। কেউ সরাসরি বাজারে এসে বিক্রি করেন। কেউ আবার ফড়ে বা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। শহরের মেন রোডের ধারে ছাতু বিক্রি করছিলেন নেদাবহড়ার রবীন মাহাতো, পুকুরিয়ার ঝর্না মিদ্যা, পদ্মাবতী মিদ্যা। তাঁদের কথায়, ‘‘বছরে পুজোর আগে একবারই এই ছাতু ওঠে। আমরা কিনে এনে বিক্রি করছি। তাই দাম বেশি।’’