হলদিয়ার অগ্নিকাণ্ডে ঝলসে গিয়েছেন অন্তত ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে যে ৯ জনকে তমলুক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সকলকেই কলকাতায় স্থানান্তর করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে চার জনকে এসএসকেএমে নিয়ে আসা হয়েছে। আপাতত এসএসকেএম-এর ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাঁরা।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। সকালেই তিনি ফোন করেন হলদিয়ার বিধায়ক প্রদীপ বিজলিকে। পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন তাঁর কাছ থেকে। তবে কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ পাইপলাইন থেকে ন্যাপথা লিক হওয়ার তত্ত্ব তুলে ধরছেন। তাঁদের বক্তব্য, সম্ভবত পাইপলাইন থেকে ন্যাপথা লিক হয়েছিল। তার পরে ভোরের দিকে বৃষ্টিও হয় এলাকায়। ওই সময়ে বজ্রপাতও হয়েছিল। তার জেরেই অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকতে পরে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যদিও প্রকৃত কী কারণে আগুন লাগল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পুলিশও তদন্তের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নীরঞ্জন কুমার জানান, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার পর অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শুরু করেছে।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস কর্তৃপক্ষও প্রাথমিক ভাবে মনে করছেন, পাইপ লিক হয়েই সম্ভবত দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। যদিও এ সব পাইপ লাইনে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ চলে, তাতে লিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে বলে মনে করছেন এলাকার বিধায়ক। তিনি বলেন, “এগুলোর জন্য মোটর বাইকে করে নিরাপত্তাকর্মীরা পাহারা দেয়। রক্ষণাবেক্ষণ করে। তবে দুর্ঘটনা কখন কী ভাবে ঘটে যায়, তা তো বলা যায় না।” বিধায়কের কথায়, আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে তা প্রায় আধ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের সীমানাপ্রাচীরের বাইরেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। হলদিয়া বন্দর থেকে পাইপলাইন দিয়ে ন্যাপথা যায় হলদিয়ার পেট্রোকেমিক্যালসে। সেই পাইপলাইন পেট্রোকেমিক্যালসের ভিতরে প্রবেশের আগে একটি জায়গায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। সংস্থার তরফে দুর্ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তারা জানিয়েছে, কারখানা লাগোয়া একটি জায়গায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই একটি জায়গা ন্যাপথা চুরির সম্ভাব্য এলাকা (আনঅথরাইজ়ড ন্যাপথা থেফ্ট পয়েন্ট) বলে চিহ্নিত সংস্থার কাছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ন্যাপথা অত্যন্ত দাহ্য এবং বিপজ্জনক হাইড্রোকার্বন। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে অনুমোদনহীন উপায়ে পেট্রোপণ্য সংগ্রহ না করার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের বার বার সতর্ক করা হয় বলেও জানিয়েছে তারা।
পরে দ্বিতীয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস। সেখানে দুর্ঘটনায় কয়েক জন দগ্ধ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে তারা। জানিয়েছে, পাইপ লিক হওয়ার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করারও আশ্বাস দিয়েছে তারা। বিনা অনুমোদনে পেট্রোপণ্য নাড়াচাড়া না-করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে এলাকাবাসীদের। তবে দ্বিতীয় বিবৃতিতে ‘আনঅথরাইজ়ড ন্যাপথা থেফ্ট পয়েন্ট’-এর কথা উল্লেখ নেই।
আরও পড়ুন:
তবে কী থেকে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা নির্দিষ্ট ভাবে জানায়নি হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল্সও। তারা জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খোঁজা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা উচিত হবে না।
অগ্নিকাণ্ড প্রসঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা বলেন, “আজ ভোরে আমাদের কাছে খবর আসে ন্যাপথার পাইপলাইনে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কাছে রেললাইনের ধারে বস্তি ছিল। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে যায়। দমকল বাহিনী-সহ প্রত্যেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।” তিনি আরও বলেন, “কয়েক জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর স্থানীয় হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কয়েক জন এখনও ভর্তি আছেন। কয়েক জনকে তমলুকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তাঁদের সেখান থেকে কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়েছে।” পুলিশ সুপার জানান, এলাকায় ব্যারিকেডিং করে রাখা আছে। আপাতত ১৬-১৭ জন আহত হওয়ার খবর মিলেছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি অন্য কোনও হাসপাতালে কেউ ভর্তি আছেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।