দশমীর সন্ধেয় গঙ্গার দু’পাড়ে মানুষের ঢল নামল ধুলিয়ানের কাঞ্চনতলায়। একই দৃশ্য জঙ্গিপুরেও। বৃহস্পতিবার সন্ধেয় গঙ্গায় নৌকা বাইচ করে প্রতিমা বিসর্জন হল নিমতিতায়। শতাধিক নৌকা নিয়ে কয়েক হাজার মানুষ বাইচে যোগ দিলেন ধুলিয়ানে। সর্বত্রই ভিড়ের কথা মাথায় রেখে কড়া পুলিশি নজরদারি ছিল এ দিন। ধুলিয়ানে উপস্থিত ছিলেন জঙ্গিপুরের পুলিশ সুপার সুরিন্দর সিংহ, ফরাক্কার এসডিপিও দীপেন্দ্র তামাং।
ধুলিয়ান শহরে এ বারে পুজো হয়েছে ৫৪টি। গোটা শমসেরগঞ্জ ব্লকে ১১৯টি পুজো হয়েছে। গত বছরের চেয়ে চারটি বেশি। তবে দশমীর সন্ধেয় গঙ্গায় বিসর্জন হয়েছে ৬২টি প্রতিমা। বৃহস্পতিবারও বেলা ৩টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নিরঞ্জন চলেছে নিমতিতায়। ধুলিয়ানে ছ’ঘণ্টার এই নৌকা বাইচে মণ্ডপ থেকে এসে সমস্ত প্রতিমা জমায়েত হয় কাঞ্চনতলার গঙ্গার ঘাটে। সেখান থেকে নৌকায় তোলা হয় প্রতিমা।
ধুলিয়ানের প্রতিমা গিয়েছে গঙ্গার অপর পাড় মালদহের পারলালপুরে। সেখান থেকে বহু প্রতিমা এসেছে ধুলিয়ানের ঘাটে। জনতার ভিড় ছিল ধুলিয়ান নিমতিতা ও জঙ্গিপুরের গঙ্গা ও ভাগীরথীর পাড়ে। আবহাওয়া ভাল থাকায় নৌ-বাইচ দেখতে জমায়েত অন্য বারের ভিড়কেও ছাপিয়ে গিয়েছে। ধুলিয়ানে বাইচ দেখতে ঝাড়খণ্ডের পাকুড় থেকেও বহু মানুষ এসেছিলেন।
ধুলিয়ানের এক সাংস্কৃতিক কর্মী কল্যাণ গুপ্ত বলেন, “ধুলিয়ানে বহু দিনের প্রথা নৌ-বাইচ ও বিসর্জন। আগে সবচেয়ে আভিজাত্যপূর্ণ পুজো ছিল কাঞ্চনতলার জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো। বিকেলের মধ্যেই সে প্রতিমা ঘাটে এনে বিসর্জন হয়ে যেত। তারপরে একে একে আসত অন্য প্রতিমাগুলি। নৌকায় সে সব প্রতিমা তুলে গঙ্গার এ ঘাট থেকে অন্য ঘাটে প্রদক্ষিণ চলত। হ্যাজাকের আলো থাকত সব নৌকোয়। তবে এত বেশি ভিড় হত না তখন। গঙ্গাও এত বড় ছিল না। জলও থাকত কম।”
তিনি জানান, সময় এগিয়েছে, সঙ্গে প্রতিমার সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। নৌ-বাইচের আড়ম্বরও বেড়েছে। তবে গত দশ বছরেও এত ভিড় দেখা যায়নি বলেই জানিয়েছেন তিনি।
অন্য দিকে, জঙ্গিপুরে রাত থেকেই প্রতিমা বিসর্জনে বেশ ভিড় ছিল। স্থানীয় শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, “আগে দশমীর রাতে দল বেঁধে আসতাম গ্রাম থেকে। সঙ্গে চটের বস্তা। সেই বস্তা পেতে ভাগীরথীর সদরঘাটে বসে থাকতাম গদাইপুরের পেটকাটি দুর্গার জন্য। দূর থেকে মাঝরাতে দেখা যেত মিটমিটে হ্যাজাকের আলো। নদীর দু’পাড় জুড়ে বসত মেলা। তারপর ঘণ্টা দুয়েক ধরে নৌকা ভাড়া করে ঘুরতাম ভাগীরথীতে পেটকাটির সঙ্গে। শহর ও তার আশপাশে গোটা দশেক প্রতিমা হত তখন। মাঝরাতে প্রতিমা উঠত নৌকোয়। রাতের আঁধার কেটে আলো ফুটতেই একে একে বিসর্জন হত সব। পেটকাটিকে নিয়ে যাওয়া হত শ্মশান ঘাটে। সেখানেই মাঝ নদীতে জলে পড়তেন দেবী। এখন নৌ-বাইচের সেই ঐতিহ্য নেই ঠিকই, কিন্তু ভিড় বেড়েছে।”
শমসেরগঞ্জ ব্লকের বিডিও সমীরণকৃষ্ণ মণ্ডল ছিলেন নিমতিতার বাইচে। তিনি বলেন, “বাইচের মধ্য দিয়ে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন শমসেরগঞ্জের ঐতিহ্য। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে এ বারের নৌ-বাইচ উপভোগ করেছেন বলা যায়।”