তখন তিনি দেবনাথ স্কুলের নবম শ্রেণি। সে দিন বড়দের মুখে মুখে একটি আলোচনা। শুটিং করতে কৃষ্ণনগর আসছেন উত্তমকুমার। প্রবল ইচ্ছা থাকলেও শুটিং দেখা হয়নি। যেতে হয়েছিল স্কুলে। তাতে কি, স্কুল ফেরতা আরও কয়েকজন বন্ধ মিলে সোজা চাষাপাড়ায়। সেখানে একবাড়িতে উত্তমকুমার-সহ গোটা দলের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। গিয়ে চক্ষুস্থির। নায়কদর্শনে বাড়ির সামনে লোকের ঢল। দারোয়ান ঘেরা চওড়া ফটকের ভিতরে যতদূর দৃষ্টি যায় আঁতিপাঁতি খোঁজ। হতাশ হয়ে ফিরবেন এমন সময়ে হঠাৎ উত্তমদর্শন। স্নান সেরে বেরিয়েছেন। পড়নে গামছা! এত লোক দেখে কিছুটা বিব্রত। একটু এগিয়ে এসে বললেন ‘আপনারা কিন্তু কেউ ছবি তুলবেন না। আপনারা কি চান গামছা পড়া উত্তমকুমারের ছবি?’ বিগলিত ভিড় সমস্বরে জবাব দিয়েছিল ‘না।’
৮৮ বছরের অসুস্থ কৃষ্ণনাগরিক নির্মল সান্যালের এখনও স্পষ্ট মনে আছে সে দিনের কথা। সময়টা ছিল ১৯৫৩-৫৪। কৃষ্ণনগরে ‘সবার উপরে’ সিনেমার শুটিং করতে এসেছিলেন উত্তমকুমার। গোটা শহর জুড়ে হইহই পড়ে গিয়েছিল। ততদিনে সাড়ে চুয়াত্তর, অগ্নিপরীক্ষা, শাপমোচনের মতো হিট ছবির নায়ক হিসাবে তিনি প্রবল জনপ্রিয়। পর্দায় উত্তম-সুচিত্রা রসায়ন তুঙ্গে। এমন সময়ে কয়েকদিন কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন জায়গা জুড়ে শুটিং হয়েছিল অগ্রদূত পরিচালিত সবার উপরে ছবির। স্টেশন, কোতোয়ালি থানা, অধরের মিষ্টির দোকান, অনন্তহরি মিত্র স্ট্রিট, পুরানো সার্কিট হাউসের সামনে প্রভৃতি নানা জায়গায় হয়েছিল ছবির চিত্রগ্রহণ। তাছাড়া কাহিনীর প্রেক্ষাপটও ছিল কৃষ্ণনগর। ফলে শহরের মানুষ মেতে উঠেছিলেন উত্তমকুমারকে নিয়ে। সেই আবেগ একশ বছরে এসেও একটুও কমেনি।
আসলে অগ্রদূত গোষ্ঠীর অন্যতম তথা ছবির কাহিনীকার নিতাই ভট্টাচার্য ছিলেন নবদ্বীপের মানুষ। তিনি উত্তমকুমারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাই নবদ্বীপ বা কৃষ্ণনগরের সঙ্গে মহানায়কের পেশার বাইরে একটা সম্পর্ক ছিল।
সেই সুবাদে উত্তমকুমারের কোলে চড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল মিলন দত্তের। কৃষ্ণনগরের বহুপ্রাচীন সিনেমা হল চিত্রমন্দিরের মালিক প্রমথনাথ দত্ত ছিলেন উত্তমকুমারের ঘনিষ্ঠ। সেইসূত্রে শুটিংয়ের অবসরে দত্তবাড়িতে গল্পগাছা করতে যেতেন উত্তমকুমার।
“তখন আমার বয়স বছর তিন কি চার। উনি আমাকে কোলে নিয়ে
আদর করতেন। এমনকি একটা কবিতা লিখেছিলেন আমাকে নিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেটা হাজার চেষ্টা করেও খুঁজে পাইনি।” আক্ষেপ করছিলেন প্রমথনাথের পুত্র ৭৬ বছরের মিলন দত্ত।