দুই পক্ষের কাছেই দিনটা ছিল অস্তিত্ব প্রমাণের। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির গাড়িতে চেপে, স্টিকার-পতাকা লাগিয়ে বুক ফুলিয়ে মেয়ো রোডের সভায় গিয়েছে, তাদের লোকবল প্রায় পরিষ্কার। কিন্তু অধিকাংশ মমতা-অনুগামী তৃণমূল কর্মী হেঁটেছেন ঠিক তার উল্টো রাস্তায়। তাঁরা অনেকটাই গোপনে, মূলত ট্রেনে চেপে ক্যাথিড্রাল রোডে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় গিয়েছেন। ফলে তাঁদের সংখ্যা আন্দাজ করা কার্যত অসম্ভব। তবে ‘শহিদ দিবস’ ফেরত হিসেব বলছে, কোনও গোষ্ঠীই জেলার সর্বত্র সমান শক্তিশালী নয়।
উত্তর নদিয়ায় বরাবরই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু এলাকাগুলি ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের গড় বলে পরিচিত। তবে কৌতূহলের কেন্দ্রে ছিল চাপড়া বিধানসভা কেন্দ্র। কারণ এই চাপড়াই পর পর দুটো লোকসভা ভোটে তৃণমূল প্রার্থী মহুয়া মৈত্রকে ৫৫ হাজারের বেশি ভোটে ‘লিড’ দিয়েছে এবং তাঁর একদা-ঘনিষ্ঠ জেবের শেখই তার প্রধান কারিগর ছিলেন বলে সূত্রের দাবি। এ বার বিধায়ক হয়ে সেই জেবেরই বিদ্রোহী শিবিরের কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি হয়েছেন। অতএব একুশে জুলাই পালনের প্রস্তুতিতে চাপড়ায় জেবের-পক্ষই আপাত ভাবে কিছুটা এগিয়ে ছিল।
জেবের গোষ্ঠীর দাবি, মঙ্গলবার শুধু চাপড়া থেকেই দুটো বাস ও বেশ কয়েকটি গাড়ি বোঝাই হয়ে কর্মীরা কলকাতা রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে তাঁদের মেরে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে বিজেপির লোকজন। স্থানীয় সূত্রের খবর, বেশ কিছু তৃণমূল কর্মী গোপনে ট্রেনে চেপে কলকাতায় মমতার সভায় গিয়েছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমনই এক তৃণমূল কর্মী বুধবার দাবি করেন, “জেবের শেখের সঙ্গে তাঁর অনুগামী কিছু নেতা-কর্মী থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ কর্মীরা দিদির সঙ্গেই আছে। এখনই সামনে এলে সমস্যা হবে, তাই লুকিয়ে গিয়েছিলাম।”
সংখ্যালঘু-প্রধান চাপড়ায় তৃণমূলের অন্দরের এই বিভাজন আর কোন্দলের পুরোপুরি ফায়দা নিতে সক্রিয় হয়েছে কংগ্রেস এবং খানিকটা সফল হয়েছে। একটা বাস আর খান চারেক গাড়ি বোঝাই হয়ে কলকাতা রওনা হয়েছিলেন কংগ্রেসের নেতাকর্মীরাও। বিজেপির লোকেদের হাতে মার খেয়ে তাঁদেরও মাঝপথ থেকে ফিরতে হয়েছে বলে অভিযোগ। চাপড়া ব্লক কংগ্রেস সভাপতি আবুবক্কর শেখের দাবি, “জেবের শেখের সঙ্গে খুব বেশি হলে ৬৫-৭০ জন গিয়েছিল।” জেবেরের দাবি, “শুধু চাপড়া থেকেই দুটো বাস আর ৭৫টা গাড়িতে কর্মীরা গিয়েছিলেন।”
চাপড়া যেমন তৃণমূলের দুর্গ ছিল, কৃষ্ণনগর তেমনই ছিল তাদের বধ্যভূমি। এ বার লোকসভা ভোটেও কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫৫ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল তারা। নদিয়ার সেই জেলাসদরে আবার ছবিটা উল্টো। শহরের সাধারণ তৃণমূল নেতাকর্মীরা অনেকেই গোপনে ট্রেন ধরে মমতার সভায় গিয়েছেন। বস্তুত গোটা কৃষ্ণনগরে এখনও পর্যন্ত বিদ্রোহী শিবিরের কোনও নেতার অস্তিত্ব চোখে পড়ছে না। জেবের ঘনিষ্ঠদের একাংশও জানাচ্ছেন, অন্য এলাকা থেকে অনেকে বিদ্রোহী শিবিরের সভায় যাওয়ার ব্যাজ ও স্টিকার নিয়ে গেলেও কৃষ্ণনরের কোনও নেতার সঙ্গে জেবেরের যোগাযোগ হয়নি। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা, তৃণমূলের যুবনেতা কুণাল চৌধুরীর দাবি, “কৃষ্ণনগরের কর্মীরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই আছেন। তাঁদের অনেকেই হুমকি উপেক্ষা করে ট্রেন ধরে দিদির সভায় গিয়েছিলেন।”