গান ছাড়া বাঙালির দুর্গাপুজো ভাবাই যায় না। উৎসবের দিনগুলি রাতগুলি এখনও মাইকভাসা গানে মাতিয়ে রাখেন লতা, কিশোর, রফি, আশা, হেমন্ত প্রমুখেরা। গ্রাম, শহরের পুজোমণ্ডপ লাগোয়া মঞ্চে জমজমাট জলসা। নবীন-প্রবীণ কণ্ঠে একের পরে এক জনপ্রিয় গান। তুখোড় যন্ত্রীরা বাজাচ্ছেন হুবহু যেমনটা রেকর্ডে শোনা যায়। তাতেই মজেছে আট থেকে আশি। ফরমায়েশি গানের অনুরোধ সামাল দিতে হিমশিম ‘কন্ঠীরা’।
পুজো সন্ধ্যার এই চেনা ছবি দেখা যাবে কিনা তা নিয়ে প্রবল সংশয় শিল্পীমহলে। সপ্তাহখানেক বাদেই পুজো শুরু অথচ তেমন বায়না কোথায়। অন্যবারে এই সময়ে নতুন কোনও বায়না এলে ফিরিয়ে দিতেন যে শিল্পীরা এবার তাঁরাই উদ্যোক্তাদের টেলিফোনের প্রতীক্ষায়। জেলা থেকে কলকাতা সর্বত্র ছবিটা একই রকম।
নবদ্বীপের এক পরিচিত তবলাবাদক দিনকয়েক আগে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘বুঝতে পারছি এ বারের দুর্গাপুজোটা আমার জীবনের সেরা দুর্গাপুজো হবে।’ আবার কলকাতার এক কিশোরকন্ঠী পোস্ট করেছেন ‘১৪ বছরের পেশাগত সঙ্গীত জীবনের প্রথম পুজো কাটাব গানের অনুষ্ঠান ছাড়া।’ এখনও পুজোর পাঁচদিনে একটি অনুষ্ঠানে ডাকপাননি কৃষ্ণনগরের তবলাবাদক শ্যামল দাস, পলাশীপাড়ার লোকসঙ্গীত গায়ক বাবলু হালদার কিংবা স্বরূপগঞ্জের সঙ্গীত শিল্পী স্বপনপ্রতাপ ঘোষ। শিল্পীদের ডাক না থাকলে যন্ত্রীরাও বেকার।
দুর্গাপুজোয় জলসা বা ‘ফাংশন’ চোখের পড়ার মতো কমেছে। শিল্পী ও যন্ত্রীরা জানাচ্ছেন শারদ উৎসবের মরসুমে শুরু হয়ে ওই জলসা বা বিচিত্রানুষ্ঠান গোটা শীতকাল জুড়ে চলে। বহুক্ষেত্রে মার্চ-এপ্রিলে দোল পর্যন্ত আসে অনুষ্ঠানের বরাত। প্রতি অনুষ্ঠান পিছু একজন যন্ত্রশিল্পী কমপক্ষে দেড় থেকে দু’হাজার টাকা সাম্মানিক পান। কণ্ঠশিল্পীদের সাম্মানিক তুলনায় বেশি। পাঁচ-ছ মাস ধরে চলা এসব অনুষ্ঠানই ওই শিল্পীদের উপার্জনের মূল উৎস। কিন্তু এ বছরে অভূতপূর্ব ভাঁটা পড়েছে সেই সব অনুষ্ঠানে। অবস্থা এতটাই সঙ্গীন যে শিল্পীরা অনেকে তুলনা করছেন করোনাকালের সঙ্গে।
কিন্তু কেন এই অবস্থা? শিল্পীরা জানাচ্ছেন রাজ্যে পালাবদলের পরে বেশির ভাগ জায়গায় পুজো উদ্যোক্তারা বদলে গিয়েছে। নতুন যারা দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁদের অনীহা এবং বাজেটে কাটছাঁট এর জন্য প্রধানত দায়ী। বড় বা ছোট কোনও পুজো কমিটিই এবার জলসা আয়োজনের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
সঙ্গীত শিল্পী তন্ময় শুভ্র দাস বলেন “সার্বিক ভাবে এবার অনুষ্ঠানের হাল দেখে করোনার সময়ের কথা মনে পড়ছে। আগে মহালয়ার সময় থেকেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যেত। এবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুজোর দিনই অনুষ্ঠান হচ্ছে। অনেকে এখনও ডাক পাননি।” নবদ্বীপের এক যন্ত্রশিল্পী জানান গতবছর তিনি পুজো থেকে রাস পর্যন্ত ৫৫টি অনুষ্ঠান করেছিলেন। এ বারে পুজোর দিনগুলো ছাড়া ‘বুকিং’ হয়নি। অক্টোপ্যাড ও তবলাবাদক আদিত্য সিদ্ধান্ত বলেন, “বিশ্বকর্মা পুজো থেকে জলসা শুরু হত, এ বারেহয়নি। এমনকি পুজোতেও প্রতিদিন অনুষ্ঠান নেই।”
পাশাপাশি ডিজে এবং মাইক ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশাসনের কড়াকড়ির ফলে অনেকে অনুষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন। শব্দদূষণ রোধে পুজোর দিনগুলোয় ডিজে বন্ধ ও রাত ১০টার পরে লাউডস্পিকার বাজানোয় নিষেধাজ্ঞার জের রাতের জলসার উপরে পড়েছে। সঙ্গীত শিল্পী বিশ্বরূপ সাহা বলেন, “এই ভাঁটা শুরু হয়েছে ভোটের সময় থেকে। যে সব শিল্পী, কলাকুশলী আর্থিক ভাবে উৎসব মরসুমের গানবাজনার ওপর নির্ভরশীল তাঁদের গভীর সঙ্কট।”