ভোট দিয়েই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, নন্দীগ্রামে এ বার ‘রেকর্ড’ হতে পারে। তাঁর দাবি, ২০১৬ সালে তাঁর প্রায় ৮২ হাজার ভোটে জেতার ব্যবধান ছাপিয়ে যাবেন উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ। ভোট অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বেলা গড়াতেই বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটের নামে প্রহসন হচ্ছে। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের অভিযোগ, কোথাও তাঁদের এজেন্ট নেই, সকলকে তাড়িয়ে অবাধে ছাপ্পা চলছে নন্দীগ্রামে। অভিযোগ, পুরো বিধানসভায় রিগিং করে ভোট করছে বিজেপি। একই অভিযোগে রেজিনগরে সরব বিরোধীরাও। যদিও দুই জায়গাতেই সেই অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছে বিজেপি।
নন্দীগ্রামে রিগিংয়ের অভিযোগ
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ১টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ভোট পড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি। উপনির্বাচনে এমন পরিসংখ্যান বেশ ভাল। শাসক-বিরোধী হাতাহাতি কিংবা গন্ডগোলের খবর মেলেনি। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, মাঠ ফাঁকা করে গোল দিচ্ছে শাসকদল। সকালেই আশরাফুল তুল্লা নামে কংগ্রেসের এক ব্লক সভাপতিকে অনৈতিক ভাবে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ করে হাতশিবির। অন্য দিকে, সোনাচূড়ার ভাঙাবেড়া ২৮৫, ২৮৬ নম্বর বুথে কংগ্রেসের পোলিং এজেন্ট বসানো নিয়ে অশান্তি হয় বলে অভিযোগ। বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে। মিলনের অভিযোগ, তাঁদের এজেন্টদের উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাল্টা বিজেপি বলে, তাঁদের পোলিং এজেন্ট ছিলেনই না। মিলনকে কটাক্ষ করে বলা হয়, ‘‘প্লেয়ারই নেই, খেলবেন কী?’’ বেলা গড়ায়। ভোট লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মিলন। একই অভিযোগ, বাম এবং আইএসএফের। আইএসএফ চেয়ারম্যান নওশাদ সিদ্দিকী সমাজমাধ্যমে কটাক্ষ করে লেখেন, ‘‘নির্বাচনী আপডেট: অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।’’ নন্দীগ্রামের কালীচরণপুর ২৪১ এবং ২৪২ নম্বর বুথে অবৈধ জমায়েত সরাতে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। স্থানীয় মহিলারা অভিযোগ করেন তাঁদের ভোটার স্লিপ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ভোট দিতেই দেওয়া হয়নি! একই অভিযোগ ২৩৪ নম্বর বুথ কেন্দামারি গ্রাম পঞ্চায়েতে। সেখানে তৃণমূল নেতার দোকান ঘর ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
দুপুর থেকে প্রায় একাই এলাকায় হাঁটতে দেখা যায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলনকে। ২৮৫ এবং ২৮৬ নম্বর বুথ এলাকায় তিনি যেতেই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি এবং ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়।
রেজিনগরে ভোটলুট!
সকালে গ্রেফতারির আগে যে অভিযোগ হুমায়ুন কবীর করেছিলেন, বেলা গড়াতে সেই অভিযোগে একসঙ্গে সরব মমতা তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং সিপিএম। রেজিনগরে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৫৬ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। কিন্তু একত্রে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলল মমতা তৃণমূল এবং কংগ্রেস। বিজেপির বিরুদ্ধে বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট দেওয়ার অভিযোগে শোরগোল রেজিনগরে। বিজেপি অবশ্য অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে বলেই দাবি শাসকের।
মঙ্গলবার ভোট দিয়ে বার হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে রাজ্য পুলিশ-প্রশাসন এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন। তাঁর ছেড়ে দেওয়া রেজিনগর বিধানসভা গায়ের জোরে বিজেপি দখল করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘উপনির্বাচন ঘিরে যে পরিস্থিতি, তাতে দেশের ইমার্জেন্সির কথা মনে পড়ে গেল। ভোট করাবার দরকার কী ছিল!’’ শেষমেশ নির্বাচনী বিধিভঙ্গ, পুলিশকে হুমকি এবং সমর্থকদের প্ররোচিত করার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন হুমায়ুন।
দুপুরে মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল আলম এবং ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল প্রার্থী শফিউজ্জামান শেখ পৃথক ভাবে অভিযোগ করেন, বেশির ভাগ বুথ থেকে তাঁদের এজেন্টদের জোর করে বার করে দেওয়া হয়েছে। শফিউজ্জামান আবার দুষেছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতাকে। তিনি বলেন, ‘‘হুমায়ুন কবীর বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূলকে হারাতে বিজেপি আর কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন। আজ সেই বিজেপির বিরুদ্ধেই লড়াই করতে গিয়ে তাঁর এমন পরিণতি (গ্রেফতারি)।’’ পরক্ষণেই গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থীর সংযোজন, ‘‘অনেক বুথে গিয়ে দেখেছি আমাদের এজেন্টকে বার করে দিয়ে কেবল বিজেপির এজেন্টকে বসিয়ে রাখা হয়েছে।’’ মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল রেজিনগরে অবিলম্বে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ভোট অবাধ হচ্ছে না, এই অভিযোগ করে এবং নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়ে দুপুরে রেজিনগর থানার সামনে ধর্নায় বসেন কংগ্রেস প্রার্থী। জেলাশাসকের দফতরের সামনে বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন অধীর চৌধুরী। ভোটগ্রহণ প্রায় শেষের মুখে। রেজিনগরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী, হুমায়ুন-পুত্র গোলাম নবি আজ়াদের শ্লেষপূর্ণ মন্তব্য, ‘‘আমার সমস্ত উৎকণ্ঠা কেটে গিয়েছে। রেজিনগরের সকলের মতো আমিও জেনে গিয়েছি এই নির্বাচনের ফলাফল কী হতে চলেছে।’’ তাই ৯ অক্টোবর ফলঘোষণার দিন আর গণনাকেন্দ্রে যাবেন না বলে ঘোষণা আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থীর।
সকালে জলপাইগুড়ি গিয়েছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। রাজ্যের দুই উপনির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘রেজিনগরে বিজেপি যে জিতবে, তা অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু সেখানকার সংখ্যালঘুরাও এ বার বাবরি মসজিদ চান না। উন্নয়ন আর কারখানা চান।’’ আর নন্দীগ্রাম? গত বারের চেয়ে এ বার জয়ের মার্জিন পাঁচ গুণ বেশি হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন শমীক।