উত্তরবঙ্গের রাজনীতির আলোচনা করলে রাজবংশী প্রসঙ্গ আসবেই। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ এবং দার্জিলিং জেলাতেও এই সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল রাজবংশী ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে স্বীকৃতি দেওয়ার। রাজ্যে পালাবদলের পর সেই আশায় বুক বেঁধেছিল রাজবংশী এবং কামতাপুরী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী উত্তরবঙ্গে একাধিক বার সফর করেছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোনও বৈঠক হয়নি বলেই দাবি রাজবংশী নেতাদের। অবশেষে মঙ্গলবার শিলিগুড়িতে সেই বৈঠক করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, মঙ্গলবার শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠকের পাশাপাশি কামতাপুরী ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে বৈঠক করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই জন্য মঙ্গলবার সকাল থেকেই উত্তরকন্যায় রাজবংশী এবং কামতাপুরী সম্প্রদায়ের নেতৃত্বকে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ভাষার স্বীকৃতির দাবি করে কেবল প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। এ বার হয়তো সমাধান হতে চলেছে। নেতৃত্বের দাবি, সংবিধানের অষ্টম তফসিলে স্বীকৃতি দেওয়া হোক রাজবংশী ভাষাকে।
নব্বইয়ের দশকে নেপালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার পর থেকে রাজবংশী এবং কামতাপুরী সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাঁদের ইতিহাস, কৃষ্টি এবং সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়ে নিজেদের ভাষাকে সংবিধানের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছেন। অধ্যাপক মহেন্দ্রনাথ রায়ের কথায়, ‘‘আমাদের একাধিক দাবি রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হল আমাদের নিজের ভাষা। যাকে আমরা আমাদের ভাষায় ‘মাও ভাষা’ বলি। মানে নিজের ভাষা। এই ভাষাকে যদি সংবিধানের অন্তর্গত করা যায়, তবে উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, উত্তরবঙ্গের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে সারা বিশ্ব জানতে পারবে। এই ভাষাকে যদি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত করা হয়, তবে আমাদের এই অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা আইপিএস, আইএএস হতে পারবে নিজেদের ভাষায় পড়াশোনা করে।’’ ওই অধ্যাপক জানান, তাঁরা সকলে মিলে ঠিক করেছেন, রাজবংশী অথবা কামতাপুরী, যে কোনও একটি ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কামতাপুরী সংগঠনের তরফে উত্তরকন্যায় আসা অষ্টমী রায়সিংহ বলেন, ‘‘কামতাপুরী মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে সঙ্কটে। সেই ১৯৭০ থেকে ভাষার স্বীকৃতি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তার পর ভাষার জন্য একাধিক সংগঠন তৈরি হয়েছে। কখনও কেপিপি, কখনও আকসু তো কখনও কেএলও। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী আজ ডেকেছেন। সে জন্য আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।’’ তাঁর অভিযোগ, ‘‘বিগত সরকার ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ করে গিয়েছে। রাজবংশী এবং কামতাপুরীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে দিয়ে গিয়েছে।’’
আরও পড়ুন:
রাজবংশী না কামতাপুরী, কোন ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে সংগঠনগুলির সঙ্গে বৈঠক করেছেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে দুই সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবিদাওয়া রয়েছে। তবে একটি দাবিতে সকলে ঐক্যবদ্ধ— ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি। বিভিন্ন সংগঠন মিলে ‘রাজবংশী মহাসঙ্ঘ’ তৈরি হয়েছে৷ সেই মহাসংঘ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজবংশী ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, এই দাবি তুলে ধরা হবে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। মঙ্গলবারের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সদর্থক বার্তা মিলবে বলেই আশাবাদী তারা।
অন্য দিকে, রাজবংশী মহাসঙ্ঘের অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী, শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র গৌতম দেবের মন্তব্য, ‘‘প্রায় ৭৫ জন ভাষাবিদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম । কামতাপুরী এবং রাজবংশীর মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই। কিন্তু এরা দুটো শিবিরে বিভক্ত ছিল। কামতাপুর পিপলস্ পার্টি সবসময়ই আলাদা পরিচয়ের দাবি জানাত। ওই জনজাতি উত্তরবঙ্গের ভূমিপুত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদের সম্মান দিয়ে দুই ভাষাকে, তাদের সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিয়েছিলেন। এখানে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুলের’ কোনও বিষয় ছিল না। এখন যদি তাঁরা মনে করে থাকেন, যে কোনও ভাষাকে স্বীকৃতি দিলেই হবে, তবে তা-ই হোক।’’