মাত্র ১৫ বছর বয়সে কয়েক মাসের ব্যবধানে দু’বার বিয়ে!
থ হয়ে গিয়েছিলেন কুলতলি ব্লক হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত কাউন্সেলর সুপর্ণা কন্ঠ। বলে কী মেয়ে! খবর পেয়ে মাসখানেক আগে মেয়েটিকে হাসপাতালে ডেকে পাঠান সুপর্ণা। অপুষ্টিতে ভোগা চেহারা। চলতি বছরের গোড়ায় তার চেয়ে কয়েক বছরের বড় এক যুবকের সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্ক হয়। দ্রুত বিয়ে। মানিয়ে নিতে না-পারায় শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ। ফের সম্পর্ক, ফের বিয়ে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রামীণ এলাকার কিশোরীদের মধ্যে স্কুলশিক্ষা অসমাপ্ত রেখে অনেকে সংসার শুরু করে দিচ্ছে বলে মানছেন বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা। নাবালিকা বিয়ে রুখতে প্রশাসনিক প্রচার নেই, এমন নয়। স্কুলে-স্কুলে ‘কন্যাশ্রী ক্লাব’ হয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রয়েছে। খবর পেলে পুলিশের সাহায্য নিয়ে নাবালিকা বিয়ে বন্ধও হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি কড়া বার্তা দেওয়ার পরে বাড়তি তৎপরতা দেখাচ্ছে পুলিশ। শনিবারও কাকদ্বীপে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘নাবালিকা বিয়েতে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা দ্বিতীয় স্থানে। ১৮ বছরের নীচে মেয়েদের বিয়ে বন্ধ করতে হবে, না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেয়েদের পড়াশোনা করান।’’ যদিও সার্বিক ভাবে এই প্রবণতা কতটা ঠেকানো যাবে, তা নিয়ে সংশয়থেকে যাচ্ছে।
কেন? সুন্দরবন জুড়ে বাল্যবিবাহ রোধে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্ণধার শক্তিপদ মণ্ডলের দাবি, ‘‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের নেতারা এই সব সামাজিক ব্যাপারের মধ্যে ঢুকে পড়ছেন। ভোট-ব্যাঙ্ক রক্ষা করতে তাঁরা প্রশাসনকে আড়াল করে বিয়েতে মদত দিচ্ছেন। কিন্তু বহু নাবালিকার নাম থেকে যাচ্ছে স্কুলের খাতায়। ফলে, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী প্রকল্পের সুবিধাও মিলছে।’’ বস্তুত, সুন্দরবন-সহ জেলার গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। পাশাপাশি, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে কিশোরী মায়ের সংখ্যাও। শুধু কুলতলি ব্লক হাসপাতাল সূত্রের খবর, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অগস্ট মাস পর্যন্ত শুধু সেখানেই ৪৩৮ জন কিশোরী মা হয়েছে।
দিন কয়েক আগে কুলতলি ব্লক হাসপাতালে আসে মৈপীঠের ১৩ বছরের অন্তঃসত্ত্বা এক কিশোরী। বাবা-মা ভিন্ রাজ্যে কাজ করেন। কিশোরী থাকত দিদিমার কাছে। বছর খানেক আগে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তে পড়তেই এক ভ্যানচালকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। দু’জনে পালিয়ে বিয়ে করে। পরে, ছেলের বাবা-মা বিয়ে মেনে নেন। দিদিমার কথায়, “অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু মেয়ে বুঝলে তো! এখন মেনে নেওয়া ছাড়া কী আর করব!”
কেন বাড়ছে নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা? সুপর্ণা মনে করেন, গ্রামীণ এলাকায় ‘ভাল’ ছেলে পেলে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা চিরকালই রয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা কয়েক গুণ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে টিকছে না। কিন্তু তাতে পিছ-পা হচ্ছে না কিশোরীরা। শিক্ষকদের একাংশ মনে করেন, গ্রামীণ এলাকায় মেয়েদের স্কুলে আনা সম্ভব হলেও পর্যাপ্ত বালিকা বিদ্যালয় নেই। ছেলে-মেয়ে এক সঙ্গে পড়াশোনা করছে। প্রেম বাড়ছে। পাশাপাশি, ১৪-১৫ বছরে এখন ছেলেরা পড়াশোনা ছেড়ে ভিন্-রাজ্যে কাজে যাচ্ছে। হাতে টাকাপয়সা আসছে। এলাকায় ফিরে তারা সমবয়সী বা কম বয়সের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে বিয়ে করছে। সমাজকর্মীদের বড় অংশের অভিযোগ, এ ব্যাপারে ইন্ধন জোগাচ্ছে মোবাইল ফোনে দেখা ছবি-ভিডিয়ো। গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের হাতেও তাপৌঁছে যাচ্ছে।
কুলতলির জামতলা ভগবানচন্দ্র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শান্তনু ঘোষাল বলেন, ‘‘অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, করোনা পর্বে লকডাউন বহু ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার ফলে মোবাইল আসক্তি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। বন্দিদশা কাটাতে সুযোগ পেলেই ওরা বেরিয়ে যেতে চাইছে। হুটহাট প্রেম-বিয়ে, এ সব সম্ভবত ওই মানসিক পরিবর্তন থেকে।’’
রয়েছে রাজনৈতিক চাপান-উতোর। নাম না করে তৃণমূলকে দুষে কুলতলির বিজেপি নেত্রী মাধবী মহলদার বলেন, ‘‘এত দিন স্কুলে পড়াশোনার পরিকাঠামো, ছোট ছেলেমেয়েদের সামনে দিশা ছিল না। ফলে, তারা প্রেম-বিয়ে নিয়েই আছে। শিক্ষার মান উন্নত হলে, ছেলে-মেয়েদের বেশি করে কর্মমুখী প্রশিক্ষণে যুক্ত করা গেলে সমস্যা মিটবে। মুখ্যমন্ত্রী সে ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন।’’ তৃণমূলের স্থানীয় এক নেতার পাল্টা দাবি, “আমাদের সরকার থাকাকালীন কন্যাশ্রী প্রকল্প হয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধে যথেষ্ট প্রচার চলেছে। আমরাও যথাসাধ্য মানুষকে বুঝিয়েছি। তবে সকলকে সচেতন করা যায়নি।”
ফলে সচেতনতার অভাব, মোবাইলের কুপ্রভাব, রাজনীতির চক্কর— বন্ধ হয় না নাবালিকাদের বিয়ে। সন্তানধারণ।
(শেষ)