মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়া বাজার থেকে আট কিলোমিটার মতো দূর। গ্রামের গলিপথে বাড়ি। সামনের ঘরে এক শীর্ণকায় কিশোরীর কোলে শুয়ে এক ততোধিক শীর্ণকায় সদ্যোজাত। দেখে কে বলবে, কোলের শিশুটি কিশোরীরই সন্তান! বাচ্চার দিকে খেয়াল রাখার মতো ক্ষমতা বছর সতেরোর মেয়েটির নেই। কেমন যেন নির্জীব, দুর্বল সে।
১৪ মাস আগে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাড়ির লোক পড়শি গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে ওই নাবালিকার বিয়ে দেন। সম্প্রতি পুত্রসন্তান হয় তার। তবে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে অপুষ্ট শরীরে সংক্রমণ হয়েছিল। তিন দিন ব্লক হাসপাতালে থাকতে হয়। সবে বাপের বাড়িতে ফিরেছে সে। নাবালিকার মা বলেন, ‘‘আমাদের সময়ে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হত। মেয়ে বড় হচ্ছে দেখে পাত্রস্থ করি। কিন্তু ছেলে হওয়ার পরে রোগে ভুগে মেয়ে কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে। অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জ্বালা এখনবুঝতে পারছি।’’
লালগোলার একটি গ্রামে বছর দুয়েক আগে নাবালিকার বিয়ে দিয়েছিল পরিবার। অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়িতে তার উপরে অত্যাচার শুরু হয়। অত্যাচার মাত্রা ছাড়ানোয় কয়েক মাসের মধ্যে বাপের বাড়িতে ফিরেছে ওই তরুণী। গত মে মাসে সে আঠারোয় পা দিলে হয়েছে বিবাহ-বিচ্ছেদও। এখন সে পড়ছে স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণিতে। মেয়েটির কথায়, ‘‘পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। বাড়ির লোককে বোঝাতে পারিনি বিয়েটাই সব নয়!’’
বাল্যবিবাহ রুখতে আইন, শিশুকল্যাণ কমিটি, পুলিশ-প্রশাসন রয়েছে। রাজ্যের বিগত তৃণমূলের সরকার ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পও করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন, যে সে প্রকল্পের টাকার আশ্বাসেও নাবালিকা বিয়ে থামানো যায়নি। আটকানো যায়নি অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মাতৃত্ব। ২০২৫-এর শেষ দিক থেকে মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন নাবালিকা বিয়ে রুখতে তৎপর হয়। লাগাতার অভিযান হয়েছিল বাল্য বিবাহমুক্ত জেলা গড়তে। পুলিশ-প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে লাগাতার অভিযানে কিছুটা সুফলও মিলেছিল। নাবালিকা বিয়ের অভিযোগ পেলে তা আটকানো, এফআইআর, গ্রেফতার হচ্ছিল দেদার। তবে কাজ হয়নি।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মুর্শিদাবাদে ১৩ হাজার নাবালিকা মা হয়েছে। রাজ্যে নাবালিকা মাতৃত্বে শীর্ষে মুর্শিদাবাদ। ১০-১৩ বছরের মধ্যে সন্তান হয়েছে ২০ জনের, ১৩-১৫ বছর বয়সি মা ৮১৭ জন, ১৫-১৮ বছর বয়সি ৬,৫২৭ জন। মুর্শিদাবাদের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সন্দীপ সান্যাল বলেন, ‘‘নাবালিকা বয়সে মা হওয়া এই জেলার সমস্যা। জেলা অনেক বড়। ফলে, সংখ্যাও বেশি। আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে সব রকম ভাবে চেষ্টা করছি।’’
তার পরেও কেন নাবালিকাদের বিয়ে হচ্ছে? জেলার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহম্মদ জাহাঙ্গির আলম বলছেন, ‘‘কিছু অভিভাবক মেয়েকে পাত্রস্থ করে দায় ঝেড়ে ফেলেন। অনেকে পছন্দের পাত্র হাতছাড়া হওয়ার ভয়েও নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি, সদ্য বয়ঃসন্ধি পেরোনো নাবালক-নাবালিকাও বাস্তববুদ্ধির অভাবে পালিয়ে বিয়ে করছে।’’ বহরমপুরে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করা সংস্থার কর্ত্রী খাদিজা বানুর দাবি, ‘‘শুধু বাবা-মা বা পাত্রকে ধরলেই হবে না, বিয়ের সঙ্গে যুক্ত মৌলানা, পুরোহিতকেও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’’ একই ক্ষেত্রে কাজ করা আর এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার এক কর্তার অভিজ্ঞতা, অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ে বেআইনি বলে রেজিস্ট্রির পথে না গিয়ে অভিভাবকেরা ইমাম, মৌলানা, পুরোহিতদের ডেকে গোপনে সন্তানদের বিয়ে দিচ্ছেন।
মূলত মুসলিমদের বিয়ে দেন ইমাম, মৌলানা এবং সরকার অনুমোদিত রেজিস্ট্রারেরা। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাঁরা এমন বিয়ে দিচ্ছেন কেন? সরাসরি জবাব দেন না ‘অল ইন্ডিয়া ইমাম মুয়াজ্জিন অ্যান্ড সোশাল ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজ়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এবং লালবাগের রাধামাধব মন্দিরের সেবায়েত বিশ্বজিৎ রায়। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা নিষেধ করছেন নাবালিকা বিয়েতে। তার পরেও যদি কেউ তেমন করেন, তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিক।
হরিহরপাড়া বা লালগোলার মতো ঘটনা তাঁদের নজর এড়াল কেন? ‘পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়ন’-এর জেলা সম্পাদক দুলালি বেগমের দাবি, ‘‘নজরদারির কারণে পরিবারগুলি বিয়ে দেওয়ার কায়দা বদলেছে। চোখে পড়ার মতো অনুষ্ঠান-আয়োজন করছে না। রাতে গোপনে বিয়ে হচ্ছে। অনেকে দূরে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন।’’ বাল্যবিবাহ রোধে উল্লেখযোগ্য কাজ করা হরিহরপাড়ার ‘কন্যাশ্রী যোদ্ধা’-দের কোঅর্ডিনেটর জাকিরন বিবি বলেন, ‘‘নাবালিকা বিয়ে যারা দেয়, তাদের ওষুধ হচ্ছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নজরদারি। জুন থেকে এ পর্যন্ত ১৪টি এফআইআর করেছি। এফআইআর যাঁদের বিরুদ্ধে হচ্ছে, তাঁদের এলাকায় অন্য কোনও অভিভাবক নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন না।’’
মুখ্যমন্ত্রী নাবালিকা বিয়ে রোখায় বার বার কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। রাজ্য পুলিশের ডিআইজি (মুর্শিদাবাদ রেঞ্জ) অজিত সিংহ যাদব বলেন, ‘‘নাবালিকা বিয়ের খবর পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিয়ে আটকানো, অভিযুক্তদের গ্রেফতার চলছে। নাবালিকার অভিভাবক, পড়শিদেরও সচেতন করা হচ্ছে।’’
মাসুল দিয়ে আসে সচেতনতা। হরিহরপাড়ার নাবালিকার মা এখন বলছেন, ‘‘এত কম বয়সে সন্তান হওয়ার ধকল মেয়ে সহ্য করতে পারেনি। হাসপাতালে যখন ছিল, তিন দিন দুশ্চিন্তায় চোখের পাতা এক করতে পারিনি আমি আর ওর বাবা!’’
(চলবে)