অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ায় ক্ষোভের আঁচ ক্রমশ বাড়ছে জেলায় জেলায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, ২০ অগস্ট বেলা ১২টা পর্যন্ত কোনও যোগ্য মহিলার অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার ৩০০০ টাকা না ঢুকলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে রাজ্য সরকার। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর সেই আশ্বাসের পরেও বৃহস্পতিবার দুপুরে দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে মহকুমাশাসকের (এসডিও) দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখালেন এখনও পর্যন্ত অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া কিছু মহিলা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে এসডিও অফিসের গেট জোর করে খুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারী মহিলাদের একাংশ। তাঁদের সামাল দিতে হিমশিম খান এসডিও অফিসে কর্মরত নিরাপত্তারক্ষীরা। পরিস্থিতি ক্রমশ অশান্ত হয়ে ওঠায় শেষপর্যন্ত এসডিও অফিসের মূল প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে হয়। কিন্তু তার পরেও মহিলাদের বিক্ষোভ থামেনি। তাঁদের কয়েক জন ক্রমাগত দরজায় কিল-চড় মারতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরে বালুরঘাট থানার আইসি সুমন্ত বিশ্বাস বিশাল পুলিশবাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছোন। তখন পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এলাকায় উত্তেজনা রয়েছে। বিক্ষোভকারী মহিলাদের অভিযোগ, বিগত তিন মাস ধরে তাঁরা টাকা পাননি। প্রশ্ন তুলেছেন, অন্য অনেকেই যখন টাকা পাচ্ছেন, তা হলে তাঁদের নাম কেন বাদ দেওয়া হয়েছে?
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে মালদহে ইংলিশবাজার পুরসভায় বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ দেখান শতাধিক মহিলা। তাঁদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পরিষেবা পেতে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। তাঁদের দাবি, অনেকেরই পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। কারও স্বামী সব্জি বিক্রি করেন, আবার কেউ ফুটপাতে ছোট দোকান করে সংসার চালান। অনেকেরই টালির বাড়ি। অর্থাৎ সরকারি মাপকাঠিতে তাঁরা ‘যোগ্য’। কিন্তু এর পরেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা তাঁদের অ্যাকাউন্টে ঢুকছে না। কেন টাকা পাচ্ছেন না, তা জানতে পুরসভায় এসে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। বিক্ষোভকারী মহিলাদের আরও অভিযোগ, টাকা না ঢোকার কারণ হিসেবে অনেকের পরিবারের বাড়িতে তিনটি ঘর থাকার কথা দেখানো হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, একটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা যদি ৮ থেকে ১০ জন হয়, তা হলে কি সকলকে একটি ঘরেই থাকতে হবে? বাড়িতে কয়েকটি ঘর থাকলেই যে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল, এমনটা নয় বলেই দাবি তাঁদের।
অভিযোগ, পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলে এখনও বহু যোগ্য মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাননি। তারই প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার আসানসোল মহকুমা শাসকের অফিসে বিক্ষোভ দেখান অন্নপূর্ণা থেকে বঞ্চিত মহিলাদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, অনলাইন ও অফলাইন আবেদন করেও অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণার টাকা আসেনি। এর আগে বুধবারও আসানসোলের মহকুমাশাসকের দফতরে ঢুকে কয়েক জন মহিলা বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার আসানসোলের মহকুমাশাসক সাধন দেবনাথ মাইকিং করে জানিয়েছেন, যাঁরা অন্নপূর্ণার টাকা পাননি, তাঁদের অনলাইনে অভিযোগ জানাতে হবে। বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে রঘুনাথপুর-চন্দনকিয়ারি রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন টাকা না পাওয়া মহিলারা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তার আগে রঘুনাথপুর মহকুমাশাসকের কার্যালয়েও বিক্ষোভ হয়। অবরোধকারী মহিলাদের দাবি, তাঁরা আগে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের টাকা পেতেন। কিন্তু যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা ঢোকেনি।
আরও পড়ুন:
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না মেলায় বিক্ষোভের জেরে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভে স্তব্ধ হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার যশোর রোড। মধ্যমগ্রাম চৌমাথায় অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া মহিলাদের বিক্ষোভ ঘিরে কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। যার জেরে প্রভাব পড়ে জাতীয় সড়ক যশোর রোডেও। প্রথমে মধ্যমগ্রাম চৌমাথা সংলগ্ন সোদপুর রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান উপভোক্তারা। প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট ধরে চলে অবরোধ। এর জেরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে একাধিক যানবাহন। তৈরি হয় যানজট। খবর পেয়ে মধ্যমগ্রাম থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে এবং অবশেষে অবরোধ তুলে দেওয়া হয়। এর পর বিক্ষোভকারীরা মধ্যমগ্রাম পুরসভার চারতলায় গিয়ে পুরসভার এগজ়িকিউটিভ অফিসারের ঘর ঘেরাও করে জবাব চান। পুরসভার অন্দরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন তাঁরা। দফায় দফায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুরসভা চত্বরেও উত্তেজনা ছড়ায়।
অন্নপূর্ণা-বিক্ষোভে বৃহস্পতিবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভাও। অভিযোগ, বিক্ষোভের সময় পুরসভায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সেই সময় পুরসভায় উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক সুমন হীরা। পরে অশোকনগর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ‘ভেরিফিকেশন’ করা হয়েছিল এবং অনেকের ক্ষেত্রে সরকারি ওয়েবসাইটেও ‘অ্যাপ্রুভড’ (অনুমোদিত) দেখানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারি ওয়েবসাইটে কারও কারও ক্ষেত্রে তিনটি বাড়ি রয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। ফলে প্রকৃত উপভোক্তা হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের টাকা মেলেনি। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, অশোকনগর এলাকায় অন্নপূর্ণা যোজনার প্রায় ২৫ হাজার উপভোক্তা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু মহিলা টাকা পেলেও এখনও অনেকেই পাননি। মধ্যমগ্রাম, অশোকনগরের পাশাপাশি ওই জেলারই বনগাঁতেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গিয়েছে।