তারাপীঠের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ধৃত হোটেল মালিক ও তাঁর ছেলেকে সাত দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিল রামপুরহাট মহকুমা আদালত। সোমবার ভোরের অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েক জনের এখনও সন্ধান মেলেনি বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তাঁদের খোঁজে মঙ্গলবার হোটেল লাগোয়া পুকুরে ডুবুরি নামানো হয়। অন্য দিকে, নিরাপত্তাজনিত গাফিলতির অভিযোগে তারাপীঠের ১৫টি হোটেল বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সোমবার ভোরে তারাপীঠের ওই বেসরকারি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ন’জন আবাসিক ঝলছে মারা যান। ঘটনার রাতেই হোটেলের মালিক প্রবীর পাল ও তার ছেলে কল্যাণ আশিস পালকে গ্রেফতার করেছিল তারাপীঠ থানার পুলিশ। সূত্রের খবর, বাবা-ছেলে মিলেই চালাতেন ‘বিদেশিনী’ নামে ওই হোটেলটি। মঙ্গলবার ধৃতদের রামপুরহাট মহকুমা আদালতে তোলা হয়। তদন্তের স্বার্থে ধৃত দু’জনকেই ১৪ দিনের হেফাজতে চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন করে পুলিশ। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে ধৃত দু’জনকে সাত দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।
প্রশাসন সূত্রের খবর, অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেল থেকে মোট ২৮ জনকে সুস্থ অবস্থায় নিরাপদে বার করা সম্ভব হয়। সাত জন এখনও রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মৃতদের মধ্যে দুই শিশু ছাড়াও এক মহিলা এবং পাঁচ জন পুরুষ রয়েছেন। মেঘালয়ের সাউথ গারো হিল্স জেলার শিববাড়ি গ্রাম থেকে তারাপীঠে পুজো দিতে এসেছিল একটি পরিবার। মৃত্যু হয়েছে সেই পরিবারের রাজেন্দ্র নাথ, তাঁর স্ত্রী আশা নাথ, তাঁদের আট বছরের পুত্র ঔষনাথ মদকের। ওই পরিবারের সদস্য বুরান মদক এবং তাঁর ১০ বছরের পুত্র শিবরাজ মদককেও বাঁচানো যায়নি। এ ছাড়া, মৃতদের তালিকায় আলিপুরদুয়ারের তিন জন রয়েছেন। তাঁরা হলেন কমল রায়, অমিত পাল এবং সুবীর সাহা।
আরও পড়ুন:
তারাপীঠ মন্দিরের পাশে তারাপীঠ থানা থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে হোটেল ‘বিদেশিনী’। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়েই তারাপীঠ এবং রামপুরহাট থানার পুলিশ সেখানে পৌঁছে যায়। দমকলকর্মীরা বেশ কিছু ক্ষণের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তাঁদের প্রাথমিক অনুমান, শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে। হোটেল সূত্রে খবর, ফাইবারের অন্দরসজ্জা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। আগুনের গ্রাস থেকে বেঁচে যাওয়া এক আবাসিক জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ঘরে থাকতে না পেরে বেরিয়ে এসে আবাসিকদের অনেকেই ছুটেছিলেন রিসেপশনের দিকে। হোটেলের পিছন দিকে নিরাপদ রাস্তা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারের ফলে সেই রাস্তা আর খুঁজে পাননি তাঁরা। দুর্ঘটনার পরেই অভিযোগের আঙুল উঠছে প্রশাসন, দমকলের দিকে। প্রশ্ন উঠছে, কী ভাবে দমকলের ছাড়পত্র পায় এই হোটেলগুলি? কতটা সৎ ভাবে অডিট করেন আধিকারিকেরা? প্রতিটা অগ্নিকাণ্ডের পরে এই প্রশ্নগুলি ওঠে, কমিটি তৈরি হয়, তার পরেও কেন তার উত্তর খোঁজা হয় না, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। দমকলের প্রাক্তন, বর্তমান অফিসারদের অনেকেরই মতে, ভূত আসলে সর্ষের মধ্যেই।
নিরাপত্তায় খামতি, ১৫টি হোটেল বন্ধের নির্দেশ
অগ্নিকাণ্ডের পরে তারাপীঠের হোটেলগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। হোটেলগুলি নিরাপত্তা সংক্রান্ত সরকারি সমস্ত নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হবে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছেন রামপুরহাটের মহকুমাশাসক রাঠৌর অশ্বিন বাবু সিংহ। নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে ইতিমধ্যেই ১৫টি হোটেল বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে জেলাস্তরে একটি বৈঠক হয় মঙ্গলবার। সেই বৈঠকে পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা এবং হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কী কী পদক্ষেপ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মহকুমাশাসক রাঠৌর। তিনি জানান, এই সব দিক খতিয়ে দেখার জন্য পাঁচটি দল গঠন করা হয়েছে। সেই দলে থাকবেন দমকল, বিদ্যুৎ দফতর এবং পূর্ত দফতরের কর্মীরা। থাকবে পুলিশও। এই দলগুলি এলাকার প্রতিটি হোটেলে গিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই কাজ শেষ করা হবে।
মহকুমাশাসক আরও জানিয়েছেন, এর আগেও বেশ কয়েকটি হোটেলকে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। নিরাপত্তা সংক্রান্ত খামতি থাকার কারণে সেই হোটেলগুলিকে নোটিস পাঠানো হয়। কিন্তু তারা কোনও রকম সহযোগিতা করেনি। এ বার আরও ১৫টি হোটেলকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। সেই হোটেলগুলিকে বন্ধ করে দেওয়া হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে কোনও ভাবেই আপস করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। রাঠৌর বলেন, ‘‘হোটেলের কর্মী এবং ম্যানেজারদের নিয়ে একটা মহড়ার আয়োজন করা হবে কৌশিকী অমাবস্যার আগেই। দমকলের কর্মীরা তাঁদের প্রশিক্ষণ দেবেন। আগুন লাগলে কী ভাবে তার মোকাবিলা করা সম্ভব, সে বিষয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’’
হোটেল লাগোয়া পুকুরে ডুবুরি
সোমবারের অগ্নিকাণ্ডের সময়ে তারাপীঠের ‘বিদেশিনী’ হোটেলে আবাসিক-সহ ৪৩ জন ছিলেন বলে সূত্রের খবর। তাঁদের মধ্যে ২২ জনকে প্রাথমিক ভাবে উদ্ধার করা হলেও হাসপাতালে তাঁদের মধ্যে ন’জনের মৃত্যু হয়। বাকিদের বেশির ভাগের খোঁজ মিললেও কয়েক জনের এখনও সন্ধান মেলেনি। ওই নিখোঁজদের মধ্যে কেউ পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কি না, বা পুকুরে তাঁদের কারও দেহ পড়ে রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছেন তদন্তকারীরা। মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে ডুবুরি নিয়ে যায় পুলিশ। দুর্ঘটনাস্থল লাগোয়া ওই পুকুরে ডুবুরি নামিয়ে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়।