তৃণমূল আমলে তিনি ছিলেন ‘বাঘ’। যিনি পুলিশকে ‘বোম’ মারার নিদান দিতেন। ফোনে পুলিশ আধিকারিকের ‘বাপবাপান্ত’ করতেন। ভরা সভায় দলীয় নেতাদের ভর্ৎসনা করতেন। তৃণমূল আমলের ১৫ বছরে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যে বার বার ধমক দিয়েছেন বিরোধীদের। তড়পে কখনও ‘গুড়-বাতাসা’, কখনও ‘চড়াম-চড়াম’ নিদান দিয়েছেন। তাঁর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাননি শঙ্খ ঘোষের মতো কবিও। তৎকালীন বিরোধী শিবিরের নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও বিস্তর। বুধবার সেই ‘বাঘ’কে নখদন্তহীন ভাবে বসে বসে দেখতে হল ভাঙচুর! পাঞ্জাবির কলার ধরে শাসানোর পরেও যিনি জোর করে হাসি ধরে রাখলেন মুখে। জমানা বদলের পর ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ অনুব্রত (কেষ্ট) মণ্ডলের হাল এমনই!
বুধবার বীরভূমের সিউড়ির তৃণমূল কার্যালয়ে দোতলার ঘরে আক্রান্ত হয়েছেন বর্তমানে ঋতব্রত তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত। ঘরে ঢুকে তাঁকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে ভাঙচুর চালান মূলত দুই যুবক। ধরা হয় তাঁর পাঞ্জাবির কলার। একদা বীরভূমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাকে হুমকি দিতে দিতে ঘরে থাকা চেয়ার-টেবিল থেকে বাতানুকূল যন্ত্র পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। টেবিলের কাচ ঠিকরে মুখে লেগেছে নেতার। আক্রমণকারীদের নানা প্রশ্নের মুখে কখনও তিনি চুপ থাকলেন। কখনও বললেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নেতা নন। তিনি কখনও পছন্দ করতেন না তাঁকে।
স্থানীয় সূত্রে খবর, হালে সিউড়ির তৃণমূল কার্যালয়টিতে গিয়ে বসছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা স্নেহভাজন কেষ্ট। বুধবার বিকেলে সেখানে গাছের ডাল, চ্যালাকাঠ, লাঠি হাতে ঢুকে পড়েন কয়েক জন। দোতলায় যেখানে অনুব্রত বসেন, সেখানে গিয়ে তাঁকে সামনে বসিয়েই হামলা চালান। আক্রমণকারীরা বলতে থাকেন, গত ১৫ বছরে বীরভূমবাসীর উপর প্রচুর অত্যাচার করেছেন কেষ্ট। ‘গরুচোর’ বলে কটাক্ষ করা হয় কেষ্টকে। কথা বলতে বলতে দুই যুবক কার্যালয়ের ভিতরে থাকা চেয়ার-টেবিল সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। অনুব্রত তাঁদের বোঝাতে থাকেন। কিন্তু কোনও কথা কানে তোলেননি সেই যুবারা। অনুব্রতকে বলতে শোনা যায়, ‘‘আমার একটা কথা শোন।’’ এক যুবক জবাবে বলেন, ‘‘আর একটা কথাও না... ১৫ বছর কত ডায়লগ দিয়েছ... কত অত্যাচার।’’ বলতে বলতে তাঁর সামনের টেবিলে গাছের ডাল দিয়ে মারেন। কাচ ছিটকে পড়ে কেষ্টর গায়ে। তবে তিনি মুখে হাসি ধরে রেখে বসে থাকেন। থামতে বলেন আক্রমণকারী দুই যুবককে। পাল্টা ধেয়ে যায় গালাগাল।
অনুব্রতের সঙ্গীরা তখন দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে। আক্রমণকারীদের এক জন প্রশ্ন করেন, ‘‘লোকগুলোকে কেন মেরে এসেছিলে?’’ চেয়ারে টানটান হয়ে বসে বর্তমানে ঋতব্রত তৃণমূল নেতার জবাব, ‘‘কাকে মেরেছি বলো।’’ পাশের যুবক বলেন, ‘‘কী! দেখাব? দেখাব কাকে কাকে মেরেছেন।’’ মাথা নেড়ে কেষ্ট বলেন, ‘‘দেখাও না, দেখাও।’’ কথা বাড়তে থাকে। এক জন বলেন, ‘‘এখান থেকে আর বেরোতে দেব না। খুন করলে তো একবারে শেষ...।’’ কেষ্ট আবার হাত নেড়ে তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুই যুবক ডান্ডা দিয়ে ভাঙতে থাকেন কার্যালয়ের বাকি জিনিসগুলো। আবার কেষ্টকে প্রশ্ন করা হয়। আক্রমণকারীদের এক জন বলেন, ‘‘আপনি এখানে বসেন কী জন্য?’’ জবাবের অপেক্ষা করেননি তাঁরা। আবার মন দেন ভাঙচুরে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কেষ্টর ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন করেন আক্রমণকারীরা। কেষ্ট বলতে থাকেন, “আমি অভিষেককে পছন্দ করি না। আমি ওকে পছন্দ করি না...।’’ অন্য দিকে, আক্রমণকারীদের দাবি, তাঁরা ’আমজনতা’। গত ১৫ বছর তৃণমূল আমলে কেষ্টর জন্য নানা ভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে নানা কুকাজ করেছেন ওই নেতা।
বেশ কিছু ক্ষণ পরে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। তারা নিরস্ত্র করে দুই আগন্তুককে। বাইরে তাঁদের আরও কয়েক জন সঙ্গীকে দেখা যায়। তাঁরা পুলিশকে বলেন, ‘‘এত অত্যাচার করেছে। একে ছেড়ে দেব?’’ এক আক্রমণকারীর দাবি, কেষ্ট তাঁদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, “খারাপ কাজ না করলে এমনি এমনি ক্ষমা চায় কেউ?” ওই যুবকদের কার্যালয় থেকে বার করে গাড়িতে তোলে পুলিশ।
আক্রমণকারীরা নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক কর্মী বা সমর্থক কি না পরিষ্কার নয়। কেষ্টর উপর হামলার নিন্দা করেছে দুই তৃণমূলই। অন্য দিকে, আক্রমণকারীদের পুলিশ বার করে নিয়ে যাওয়ার পরে দুই অনুগামীর কাঁধে ভর দিয়ে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠেন কেষ্ট। তিনি কি আহত? সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ‘তোমাদের ভালবাসি’ ছাড়া আর কিছু বলেননি কেষ্ট।
তবে গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, হামলাকারীরা বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতী। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নেতা অনুব্রত মণ্ডলের উপরে যে ভাবে হামলা হয়েছে, তার নিন্দার ভাষা নেই। রাজ্যে সরকার বদলের পর মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজকের ঘটনা বুঝিয়ে দিল শাসকদল শাসকের আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘গণতান্ত্রিক পরিবেশে বিরোধীদের যদি এই অবস্থা হয়... অনুব্রত মণ্ডল কেবল আমাদের নেতা নন, তিনি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। আমরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছি।’’ অন্য দিকে, বীরভূমের ঋতব্রত তৃণমূলের নেতা কাজল শেখের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘‘দেখে মনে হচ্ছে, সাজানো ঘটনা।’’ তবে অনুব্রতের সঙ্গে কাজলের সম্পর্ক ‘মধুর’ বলেই সকলে জানেন।
পর পর কয়েক দিন তাঁর উপর হামলার কথা মনে করিয়ে মমতা তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘এই সব ঘটনা কেবল সমাজের পক্ষেই নয়, আইনশৃঙ্খলার পক্ষে ক্ষতিকর। রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’’ বেলেঘাটার বিধায়কের কটাক্ষ, ‘‘তার পরেও একটু বাদে হয়তো বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বিবৃতি আসবে, ‘যারা এই হামলায় যুক্ত, তাদের সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই।’’’ পাল্টা বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহার মন্তব্য, ‘‘কিছু দিন আগে উনি (অনুব্রত) বলেছিলেন, ‘সেই ফুটুনি কি আমার আর আছে!’ ফুটুনি থাকে জনতা-জনার্দনের হাতে। তাঁরা অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত হয়েছেন এই অনুব্রত মণ্ডলদের হাতে। তাই তাঁরা আজকের এমন ঘটনা ঘটাচ্ছেন। তবে এমন ঘটনা কাঙ্খিত নয়। যাঁরা অত্যাচারিত হয়েছেন, তাঁদের বলব আপনারা আইনের উপরে ভরসা রাখুন। পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন চলছে। সেখানে এমন ঘটনা কোনও ভাবে বরদাস্ত করা হবে না।’’