পরনে গোলাপি-নীল টি-শার্ট আর ট্র্যাকস্যুট। দোহারা চেহারা। উস্কোখুস্কো চুল। অভিযোগ, কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেমিকাকে নিজের মেসে ডেকে গলা কেটে খুন করেছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, প্রমাণ লোপাট করতে দেহ বস্তায় ভরে বাইকে বেঁধে সোজা অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে যাচ্ছিলেন! যদিও থানা থেকে আদালত যাওয়া পর্যন্ত একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি ঘাতক।
যুবকের নাম অমিতকুমার মাহাতো। পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি দু’-দুটো চাকরির পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। কিছু দিন আগে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আইনি জটে নিয়োগ অবশ্য আটকে। তার পর অগ্নিবীরের পরীক্ষাতেও সফল হয়েছেন অমিত।
অন্য দিকে, অমিতের প্রেমিকা নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। ওই তরুণীর বাবার দাবি, দু’দিনের মধ্যেই পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি নার্সিং কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল তাঁর।কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে আর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তিনি। মেসের মালিককে ফোন করেও মেয়ের সন্ধান না পেয়ে পুরুলিয়া শহরে চলে যান। তার পর পুলিশের কাছে জানতে পারেন, মেয়ে আর নেই!
পুলিশ সূত্রে খবর, প্রেমিকা-প্রেমিকা, দু’জনেরই বাড়ি পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি থানা এলাকায়। সম্পর্ক বছর চারেকের। কিন্তু দুই পরিবারেরই দাবি, তাঁরা এ নিয়ে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতেন না।
শনিবার দুপুরে নিজের মেসে প্রেমিকাকে ডেকেছিলেন অমিত। সেখানে দু’জনের মধ্যে কী নিয়ে কথা হয়, জানা যায়নি। তবে এটুকু জানা গিয়েছে, ওই ঘরেই প্রেমিকার গলা কাটেন অমিত। কিছুক্ষণ পর প্রেমিকার রক্তাক্ত দেহ ভরেছিলেন বস্তায়। শনিবার মাঝরাতে পুরুলিয়া শহর থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে বলরামপুর থানার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। রাতেই থানায় নিয়ে যাওয়া হয় অভিযুক্তকে। দেহ পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ এ-ও জানতে পেরেছে, সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তির আগমনে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল। আবার খানিক মিটমাটও হয়েছিল অমিতদের। তাই শুক্রবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর মেসের ঘরেই চলে গিয়েছিলেন প্রেমিকা। অমিত পুলিশকে বলেছেন, ওই সময়ে রুমমেট ছিলেন না। তিনি খুনের কথা স্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন পুরোটাই একাহাতে করেছেন।
আরও পড়ুন:
তবে পুলিশ মনে করছে, খুন সন্ধ্যা নাগাদ করলেও দেহ লোপাটের জন্য মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন অমিত। তখনও মেসের অন্য আবাসিকদের কেউ ওই ঘরে যাননি? সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। ধৃতের রুমমেট সরোজ কুমারের দাবি, তিনি বিকেল পর্যন্ত মেসের ঘরেই ছিলেন। বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ খেলতে বেরিয়ে যান। তখনও অমিত একাই ছিলেন। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ মেসে ফিরে অমিতকে দেখতে পাননি। ওই যুবকের কথায়, ‘‘ঘরে কেমন একটা আঁশটে গন্ধ পাচ্ছিলাম। জানি না, কেমন একটা ভয়ের অনুভূতি তৈরি হয়েছিল।’’
তদন্তকারীদের সন্দেহ সন্ধ্যাতেও ওই মেসেই কোথাও ঘাপটি মেরে ছিলেন অমিত। রাতে বাইকের পিছনে একটি বস্তা উঠিয়ে তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পরে স্থানীয় কয়েক জনের সন্দেহ হয়। সেই সূত্র ধরে মেসবাড়িতে পৌঁছেছিল পুরুলিয়া সদর এবং টামনা থানার পুলিশ। সংগ্রহ করা হয় প্রয়োজনীয় নমুনা। প্রেমিকার গলা কেটে খুনের আগে তাঁকে শারীরিক নিগ্রহ করা হয়েছিল কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তা-ও।
রবিবার আদালত ৯ দিনের পুলিশি হেফাজত দিয়েছে
অমিতকে। ততক্ষণে খবর গিয়েছে অমিতের বাবা গণেশ মাহাতোর কাছে। তিনি পুরুলিয়া রওনা হন। রেডিমেড পোশাক বিক্রি করে কোনও রকমে সংসার
টানেন প্রৌঢ়। তাঁর মেয়ে অর্থাৎ অমিতের দিদি সন্তানসম্ভবা। বাঘমুন্ডির স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি
করানো হয়েছে তাঁকে। সকলে তাঁকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। তার মধ্যে ছেলের গ্রেফতারির
খবর পেয়ে গণেশ জানান, কী থেকে কী হল, কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। ভেবেছিলেন সংসারের হাল ধরবে ছেলে। কিন্তু কী করল সে!