বীরভূমের ‘পাথরসম্রাট’ টুলু মণ্ডলের বেআইনি ‘ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট’ (ডিসিআর) কেলেঙ্কারিতে এ বার গ্রেফতার হলেন ভূমি দফতরের এক কর্মী-সহ দু’জন। ধৃতদের নাম বিশ্বজিৎ সাহা ও কৌসর আলি। বিশ্বজিৎ ভূমি সংস্কার দফতরের কর্মী এবং কৌসর টুলুর কর্মচারী। বৃহস্পতিবার ধৃতদের সিউড়ি এসিজেএম আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁদের ৫ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পাথর পরিবহণের সরকারি রাজস্ব আদায়ের ডিসিআর বই বিলির দায়িত্বে ছিলেন বিশ্বজিৎ। অভিযোগ, তৎকালীন আধিকারিকদের নির্দেশেই তিনি টুলু মণ্ডলের কর্মচারীদের হাতে ডিসিআর গেটে ওই বইগুলি তুলে দিতেন। সেই আসল বইয়ের নম্বরের সঙ্গেই হুবহু মিল রেখে নকল ডিসিআর বই ছাপিয়ে বীরভূম জুড়ে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব লুট করা হত। এই দুর্নীতির ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে সরকারি আইনজীবী এ দিন আদালতে কুখ্যাত আব্দুল করিম তেলগির স্ট্যাম্প পেপার কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তাঁর দাবি, তেলগি যেমন জাল স্ট্যাম্প পেপারের মাধ্যমে দেশ জুড়ে চক্র চালিয়েছিলেন, টুলু মণ্ডলের এই নকল ডিসিআর কারবারও ঠিক একইরকম বড় মাপের এক সুপরিকল্পিত কেলেঙ্কারি।
আরও পড়ুন:
তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরেই এই কারবারের তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিশ্বজিৎ সাহাকে এর আগে পাঁচবার থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তাঁর বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি থাকায় বুধবার রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে, টুলু মণ্ডলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কর্মচারী কৌসর আলিকেও বেশ কয়েক বার জেরার পর বুধবার রাতেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, টুলুর বেহিসাবি আয়ের পাশাপাশি তাঁর বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কৌসর। তাঁর কাছ থেকে একাধিক ব্যাঙ্কের চেক বইও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। সরকারি আইনজীবী বৃহস্পতিবার আদালতে দাবি করেন, ভূমি দফতরের কর্মী বিশ্বজিৎ সরাসরি কৌসরের হাতেই আসল ডিসিআর বইগুলি তুলে দিতেন, যা ব্যবহার করে পরে জাল কারবার চলত।
যদিও পুলিশের এই ভূমিকা ও গ্রেফতারি নিয়ে আদালতে তীব্র সরব হন ধৃতদের আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি, আসল অপরাধীদের আড়াল করে পুলিশ কেবল চুনোপুঁটিদের ধরছে। তৎকালীন বিএলআরও, মন্ত্রী, জেলাশাসক এবং মুখ্যমন্ত্রীকে কেন এই মামলায় ছাড় দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
বীরভূমের মহম্মদবাজার, নলহাটি-সহ একাধিক এলাকায় টুলু মণ্ডলের পাথর ও বালির একচেটিয়া কারবার ছিল। অভিযোগ, প্রশাসনের একাংশের মদতে এই নকল ডিসিআর ছাপিয়েই সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। সম্প্রতি টুলুর শ্যালক মিনার মণ্ডলের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সাড়ে ২৮ কোটি নগদ টাকা ও ১৫ কেজি সোনা উদ্ধারের পর থেকেই বেপাত্তা এই পাথর-মাফিয়া।
তদন্তকারীদের অনুমান, ইতিমধ্যেই দুবাই বা তুরস্কে পালিয়ে গিয়েছেন টুলু। সম্প্রতি সিউড়ি জেলা আদালতে তাঁকে ‘ঘোষিত অপরাধী’ তকমা দিয়ে তাঁর বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও আবেদন জানিয়েছেন সরকারি আইনজীবী। সেই আবহেই এ বার ভূমি দফতরের কর্মীর গ্রেফতারে এই পাথর-কেলেঙ্কারিতে সরকারি কর্মীদের একাংশের যোগসাজশের অভিযোগ আরও জোরালো হল বলেই মনে করা হচ্ছে।