Advertisement
E-Paper

দরজা খুললে গিলতে আসছে আগুন! পিছনের রাস্তা মেলেনি, সামনে বেরোতে গিয়েই বিপত্তি? কী ঘটে তারাপীঠের হোটেলে

তারাপীঠ মন্দিরের পাশে তারাপীঠ থানা থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে হোটেল ‘বিদেশিনী’। ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ সেখানে আগুন লেগে যায়। একতলা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। ধোঁয়া পৌঁছে যায় পাঁচতলাতেও।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০২
তারাপীঠ থানার সামনে এই হোটেলেই সোমবার ভোরে আগুন লেগেছে।

তারাপীঠ থানার সামনে এই হোটেলেই সোমবার ভোরে আগুন লেগেছে। —নিজস্ব চিত্র।

ভোর তখন সাড়ে ৪টে। দিনের আলো তেমন ফোটেনি। তারাপীঠের হোটেলে একতলার ঘরগুলিতে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন আবাসিকেরা। অধিকাংশই পুণ্যার্থী। উত্তর ২৪ পরগনা থেকে আলিপুরদুয়ার, শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবারের পুজো দিতে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে গিয়েছিলেন। আচমকা বিস্ফোরণ এবং চিৎকারে তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, ঘুম ভেঙে বাইরে চিৎকার শুনে ঘরের দরজা খুলতে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু দরজা খুলতেই আগুনের লেলিহান শিখা ধেয়ে আসে ঘরের ভিতর। যেন আগুন গিলতে এসেছিল সকলকে। সঙ্গে সঙ্গে কোনও রকমে সেই দরজা তাঁরা বন্ধ করে দেন। কিন্তু ঘরের ভিতরে জানলাও নেই! বয়স্ক এবং শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে বদ্ধ ঘরে কাটছিল প্রহর। দমকল, পুলিশ যে যেখানে পেরেছেন ফোন করে গিয়েছেন। সেখানে এক-একটা মিনিট যেন এক-একটা বছরের সমান!

তা-ও শেষরক্ষা হয়নি। অনেকে বদ্ধ ঘরে থাকতে না পেরে বেরিয়ে আসেন। হোটেলের পিছন দিক দিয়ে বেরোনোর নিরাপদ রাস্তা ছিল। কিন্তু পুণ্যার্থীরা প্রায় কেউই তা চিনতেন না। আগুন লেগে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দিক নির্দেশক চিহ্নও দেখা যায়নি। প্রাণ হাতে নিয়ে অনেকে সামনের দিকে রিসেপশনের দরজা দিয়েই বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেন। তাতেই ঘটে বিপত্তি। রিসেপশনের দিকেই আগুন ছিল। অনেকে ঝলসে যান। এ ছাড়া, ঘরের মধ্যে আটকে পড়ে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন আরও অনেকে। হোটেলের পাঁচতলা পর্যন্ত ধোঁয়া উঠে গিয়েছিল বলে দাবি আবাসিকদের।

তারাপীঠ মন্দিরের পাশে তারাপীঠ থানা থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে হোটেল ‘বিদেশিনী’। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়েই তারাপীঠ এবং রামপুরহাট থানার পুলিশ সেখানে পৌঁছে যায়। দমকলকর্মীরা বেশ কিছু ক্ষণের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তাঁদের প্রাথমিক অনুমান, শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে। হোটেল সূত্রে খবর, ফাইবারের অন্দরসজ্জা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। দমকলকর্মীদের উদ্ধারকাজে তাই কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। তাঁরা বেশ কয়েক জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন। কিন্তু অন্তত ছ’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। আহতদের রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার জন্য যাওয়া হয়েছে। মৃতদের নাম-পরিচয় এখনও জানা যায়নি।

হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল জানিয়েছেন, ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ সেখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহের এনসিবি হঠাৎ ফেটে যায় এবং সেখানে আগুন ধরে যায়। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের এখানে রাতপাহারার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা উঠে সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রগুলি সচল করেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। কিন্তু তত ক্ষণে অন্দরসজ্জার ফাইবারে আগুন ধরে যায়। আগুনটা আরও বেড়ে যায়। দমকলকর্মীরা এসে আগুন নিবিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ধোঁয়া পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।’’ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে তিনি আরও বলেন, ‘‘আতঙ্কে ঘর থেকে আবাসিকেরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন। তাঁরা বাইরে আগুনের মধ্যে পড়ে যান। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। পিছন দিক দিয়ে বেরোনোর দরজা রয়েছে। কিন্তু সেটা অনেকে খুঁজে পাননি। তাঁরা রিসেপশন দিয়ে বেরোতে শুরু করেন। তখনই অনেকের গায়ে আগুন লেগে যায়।’’

বীরভূমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নীলেশ শ্রীকান্ত গায়কোয়াড় বলেন, ‘‘যাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে, রামপুরহাট হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ১২ থেকে ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।’’

দমকলের ওসি নীলাদ্রি মজুমদার বলেন, ‘‘দোতলা পর্যন্ত আগুন ছড়িয়েছিল। কিন্তু তিনতলায় কোনও আগুন ছিল না। সেখানে অনেক ধোঁয়া ছিল। হোটেলে সিঁড়ি বা অন্যত্র সমস্ত জানলা বন্ধ ছিল। তাই ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারেনি। হোটেলে দুটো সিঁড়ি রাখতেই হয়। এখানেও সেটা ছিল। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ঠিক ছিল। আমরা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ন’জনকে উদ্ধার করেছি।’’

কোচবিহারের দিনহাটা থেকে তারাপীঠে পুজো দিতে এসেছিলেন দেবাদৃতা দত্ত। ছিলেন ওই হোটেলের দোতলায়। আগুন দেখে বারান্দা দিয়ে পাইপ পেয়ে কোনও রকমে তাঁরা নীচে নামেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা ঘুমোচ্ছিলাম। বাইরে চিৎকার শুনে দরজা খুলে দেখি প্রচণ্ড আগুন আর ধোঁয়া। বারান্দাটা না থাকলে ভিতরেই দম বন্ধ হয়ে সকলে মরে যেতাম। কী ভাবে যে নামলাম, বলতে পারব না।’’ রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘‘এখনও কয়েক জন আশঙ্কাজনক। হোটেলে আগুন নেবানোর ব্যবস্থা ঠিকঠাক ছিল কি না, দেখতে হবে। এ ভাবে তো চলতে পারে না। এত মানুষের জীবনের দায় কে নেবে? চারদিকে জতুগৃহ বানিয়ে রেখেছে।’’

Tarapith Tarapith Hotels Tarapith Temple Birbhum Fire Incident

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy