সনাতনীরা ছাড়া বিসর্জনের সময় প্রতিমাকে ছোঁয়া যাবে না! এই নিদানের আবহে সমাজকে মানবতার পাঠ পড়াতে পারেন মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমের পরিযায়ী শ্রমিকেরা। অসুস্থ অন্বেষা রায় রক্ত পেলেন সাকিবুর রহমান, আশরাফুল শেখদের কাছ থেকে। তা-ও ভিন্ রাজ্যে চিকিৎসা করাতে গিয়ে।
কর্কট রোগে আক্রান্ত আসানসোলের বাসিন্দা অন্বেষা চেন্নাইয়ে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর প্লেটলেট অনেকটা কমে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে রক্ত দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভিন্ রাজ্যে কোথা থেকে এত রক্ত জোগাড় করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন তরুণীর বাড়ির লোক। শেষ পর্যন্ত চেন্নাইয়ে কর্মরত মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূমের ছ’জন পরিযায়ী শ্রমিক তাঁকে রক্ত দিয়েছেন।
অন্বেষা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর বাবা, অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী শ্রীকান্ত রায় বলেন, “কিছু দিন আগে মেয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাজ্যের চিকিৎসকদের পরামর্শে সপ্তাহখানেক আগে ওকে চেন্নাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে জানতে পারি, মেয়ে রক্তের কর্কট রোগে আক্রান্ত। প্লেটলেটও নেমে এসেছে ছ’হাজারে। হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, দ্রুত ছ’-সাত ইউনিট রক্ত লাগবে।”
ভিন্ রাজ্যে হঠাৎ এত রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে আতান্তরে পড়েন শ্রীকান্ত। আসানসোলে তাঁর ভাইকে ফোন করে বিষয়টি জানান। তিনি মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে পরিচিত এক প্রাথমিক শিক্ষককে ফোন করে সাহায্য চান। ওই শিক্ষক চেন্নাইয়ের পরুরে থাকা পরিযায়ী শ্রমিক মইজুদ্দিন চৌধুরীকে জানালে তিনি রক্তের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। বৃহস্পতিবার ওই বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে অন্বেষাকে রক্ত দেন সাকিবুর রহমান, আশরাফুল শেখ, মইনুদ্দিন শেখ, সাহাবুল শেখ, রকেট শেখ এবং রাকেশ শেখ। রকেটের বাড়ি লালগোলার ফতেপুরে, রাকেশ বীরভূমের বাসিন্দা। বাকি চার জনের বাড়ি মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে।
এ দিন ফোনে মইজুদ্দিনবললেন, “অন্তত ১৫০ জন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক পরুর এবং তার আশপাশে থাকেন। আমাদের ওয়ট্স্যাপ গ্রুপও রয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভ করে সকলকে রক্তের প্রয়োজনের কথা জানাই। ওই ছ’জন সম্মতি দেন। আরও রক্তের প্রয়োজন হলে বাকি সদস্যেরা দেবেন বলে জানিয়েছেন।’’
রক্তদাতাদের অন্যতম রাকেশের কথায়, “ওই পরিবার চেন্নাইয়ে কাউকে চেনে না। তাঁদের অসহায়তার কথা বুঝেই আমরা এগিয়ে আসি। ওঁদের বলেছি, আরও রক্তের প্রয়োজন হলে তারও ব্যবস্থা করব।’’ শ্রীকান্ত বলছেন, “ওঁদের কাউকে আগে চিনতাম না। এক জন অপরিচিতের পাশে ওঁরা যে ভাবে দাঁড়ালেন, তা সারা জীবন মনে রাখব। ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই।’’