শিক্ষক থেকে শিল্পী। কখনও আবার পরিবেশের জন্য সরব প্রতিবাদী। কয়েক দশক ধরে শিল্পী যোগেন চৌধুরীর নানা সত্তা দেখেছে শান্তিনিকেতন। রবিবার তাঁর প্রয়াণের খবর এসে পৌঁছতেই তাই শোকস্তব্ধ শান্তিনিকেতন। আশ্রমিক থেকে শিল্পীর পরিচিতেরা সকলেই বলছেন, প্রয়াত হলেও তাঁর কয়েক দশকের কাজের মধ্যে চিরকাল থেকে যাবেন শান্তিনিকেতনে।
১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর কলাভবনে রিডার হিসেবে প্রথম যোগ দেন যোগেন চৌধুরী। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগসূত্রের শুরুটা তখনই। ক্রমে কলাভবনের অধ্যক্ষ হন তিনি। পরে বিশ্বভারতী তাঁকে ‘এমেরিটাস’ অধ্যাপকের পদ দেয়। শান্তিনিকেতন আসার পরে প্রথমে বিভিন্ন ভাড়াবাড়ি এবং পরে শান্তিনিকেতনের রতনকুঠী অতিথি নিবাসের পিছনে একটি বাড়ি কেনেন তিনি। সেখানেই থাকতেন। পরে একটি বাড়িও তৈরি করেন সেখানে। অধ্যাপনার পাশাপাশি, চলেছিল তাঁর শিল্পকর্মও।
শিল্পচর্চার সঙ্গেই শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলনেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে ‘খোয়াই বাঁচাও’ আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। বছর তিনেক আগে বিশ্বভারতীর সঙ্গে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ‘প্রতীচী’ বাড়ির জমি বিবাদের সময়েও প্রতীচীর সামনে বিদ্বজনেদের প্রতিবাদে তাঁকে যোগ দিতে দেখা গিয়েছিল।
যোগেন চৌধুরীর পরিচিতেরা বলছেন, অত্যন্ত সরল জীবনযাত্রা ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। মানুষকে শিল্পের গুরুত্ব বোঝাতে ও শিল্পকর্মকে ছড়িয়ে দিতে শান্তিনিকেতনে তিনি করেছেন একাধিক প্রদর্শনী। গত বছর মার্চে শেষ বার শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন শিল্পী। কয়েক দিন থেকে ফেরেন কলকাতায়। সেটাই যে শান্তিনিকেতনে তাঁর শেষ সফর, তা কল্পনা করতে পারছেন না বিশ্বভারতীর পড়ুয়া, অধ্যাপক থেকে শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক, কেউই।
প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, ‘‘অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন, খুব বড় মাপের শিল্পী ছিলেন। আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। তাঁর চলে যাওয়ায় অনেকখানি ক্ষতি হয়ে গেল।’’ প্রবীণ আশ্রমিক সুব্রত সেন মজুমদার বলেন, ‘‘নন্দলাল বসু, রামকিঙ্করের পরবর্তীতে সোমনাথ হোড় প্রমুখের পরে কলাভবনে যোগেন চৌধুরীর মতো শিল্পীর অবদান অনেক। শান্তিনিকেতন তাঁর অভাব অনুভব করবে।’’ কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যাপক, শিল্পী আর শিবকুমার বলেন, ‘‘যে সমস্ত শিল্পী শিল্পকর্মের মাধ্যমে বাংলাকে পথ দেখিয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম যোগেন চৌধুরী। এই মুহূর্তে তাঁর জায়গা কেউ পূরণ করতে পারবেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর প্রয়াণ অপূরণীয় ক্ষতি।”