প্রস্তাব থাকলেই বিনিয়োগ যে বাস্তবায়িত হয় না, তা কার্যত প্রমাণিত। তাই শিল্প-প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তৃণমূল সরকারের দাবি তীব্র সমালোচিত হয়েছিল। বিনিয়োগ প্রশ্নে আগের সেই অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিল বিজেপি সরকার। বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরিতে শুধু আলোচনার বদলে প্রস্তুত থাকা পরিকল্পনাগুলির দ্রুত বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়াই এই বদলের অন্যতম অঙ্গ বলে জানাচ্ছে প্রশাসনিক মহল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, গত দু’মাসে হোসিয়ারি থেকে দুগ্ধজাত শিল্প, লজিস্টিক্স থেকে ভারী ধাতব শিল্প—সব ক্ষেত্রে যে সংস্থাগুলি এখনই বিনিয়োগ বা কাজ শুরু করতে পারবে, প্রাথমিক ধাপে তাদের প্রকল্পের চাকা গড়িয়ে দেওয়ার কাজ করছে রাজ্য। সব ঠিক থাকলে শীঘ্রই পশ্চিম বর্ধমানে ধাতব শিল্পে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে চলেছে। আধিকারিকদের বক্তব্য, সেই কাজও এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আগাম প্রচার বা বিজ্ঞাপন দেখা যায়নি। এক কর্তার কথায়, “বিগত কয়েক মাসে যে শিল্প সংস্থাগুলি জানিয়েছে, তারা এখনই কাজ শুরু করতে প্রস্তুত, তাদের দিকে বাড়তি নজর দিয়েছে রাজ্য। তবে এটাও ঠিক, গভীর সমুদ্র বন্দর-সহ কিছু প্রকল্প রয়েছে, যা আলোচনাসাপেক্ষ। তবে আলোচনাতেই বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া আর সেই মৌখিক বার্তা প্রচারের পথে রাজ্য যে হাঁটবে না, তা স্পষ্ট।”
কেন এমন সিদ্ধান্ত? আধিকারিক মহল জানাচ্ছে, শিল্পে দু’ধরনের গতিবিধি হয়—এক, শিল্প সংস্থা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করলে তার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের শিল্প মন্ত্রকের অধীনে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনট্রেপ্রেনিওর মেমোরান্ডাম’ বা আইইএম-‘পার্ট-এ’ দাখিল হয়। অর্থাৎ, এই পর্বে কোনও বাণিজ্যিক সংস্থা নতুন বিনিয়োগ-উৎপাদন, চালু কারখানার সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়ে থাকে। দ্বিতীয় পর্যায়টিই আসল—তাতে যে শিল্প সংস্থা তাদের প্রস্তাব বাস্তবে কার্যকর করে বিনিয়োগ করছে, সেই তথ্য শিল্প মন্ত্রকে দাখিল হয় আইইএম-‘পার্ট-বি’-এর মাধ্যমে। তাকেই প্রকৃত বিনিয়োগ-তথ্য হিসাবে ধরেন প্রশাসনিক কর্তারা। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় পাঁচ বছরে শুধুমাত্র বিনিয়োগ প্রস্তাব (আইইএম-পার্ট-এ) এ রাজ্য যা পেয়েছিল, বাস্তবে তা কার্যকর হয়েছে অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারী বা শিল্পগোষ্ঠীগুলি কেন্দ্রকে যে আইইএম ‘পার্ট-বি’ দিয়েছে, তাতে বাস্তব বিনিয়োগের প্রশ্নে এ রাজ্যের অগ্রগতি বড় রাজ্যগুলির তুলনায় অনেকটা পিছনে। আবার বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে বিগত সরকারের যে বিপুল অঙ্কের দাবি করত, কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্য বড় রাজ্যগুলি তাতে এগিয়ে রয়েছে অনেকটা (সবিস্তার সারণিতে)।
তৃণমূল সরকারের শেষ বিশ্ব বাংলা বাণিজ্য সম্মেলনের (বিজিবিএস) পরে তারা দাবি করেছিল, সব মিলিয়ে সাতটি এমন সম্মেলনে শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে সই হয়েছে শত শত মউ। তাতে ১৯ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ-প্রস্তাব ছিল এবং তার মধ্যে ১৩ লক্ষ কোটি টাকার কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছে। তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে, বিগত রাজ্য সরকার বিনিয়োগ-অঙ্কের শ্বেতপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলেও, তা প্রকাশ পায়নি।