Advertisement
E-Paper

হাই কোর্টের নির্দেশ খারিজ! আরজি করের সন্দীপকে জামিন দিল সুপ্রিম কোর্ট, পুজোর মধ্যেই কি জেলমুক্তি

দু’বছরের বেশি সময় ধরে জেলবন্দি সন্দীপ। আর্থিক দুর্নীতি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়ার পর সন্দীপদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র সাত জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ২১:১৫
Supreme Court has granted bail to Sandip Ghosh, the former principal of RG Kar Medical College, in a case being investigated by the CBI

সুপ্রিম কোর্টে জামিন পেলেন সন্দীপ ঘোষ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে আর্থিক দুর্নীতি মামলায় সন্দীপ ঘোষকে জামিন দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীর গতি এবং দীর্ঘ বন্দিদশার কথা বিবেচনা করে এই নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি এমএম সুন্দ্রেশ এবং প্রশান্ত বি বরলের বেঞ্চ। আর্থিক দুর্নীতিতে সিবিআইয়ের মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ। তবে জামিনের সেই আর্জি খারিজ করে দেয় উচ্চ আদালত। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করেন সন্দীপ। শুক্রবার তাঁর আবেদন মঞ্জুর করে শীর্ষ আদালত।

দু’বছরের বেশি সময় ধরে জেলবন্দি সন্দীপ। আর্থিক দুর্নীতি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়ার পর সন্দীপদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র সাত জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে। শীর্ষ আদালতে সেই বিষয়ই তুলে ধরেন সন্দীপের আইনজীবী। বিচারপ্রক্রিয়ার এই ধীরগতির কথা বিবেচনা করে তাঁর জামিনের আর্জি মঞ্জুর করল সুপ্রিম কোর্ট। অন্য দিকে, আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসকের ধর্ষণ এবং খুনের মামলায় আগেই জামিন পেয়েছিলেন সন্দীপ।

আরজি করে চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার পরে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সন্দীপকে গ্রেফতার করে সিবিআই। পরে এই মামলার তদন্ত শুরু করে আর এক কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি-ও। তাদের অভিযোগ, আরজি কর হাসপাতালের অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিকাদারদের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ টাকা পরিকল্পিত ভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আত্মসাৎ করা হয়েছে ওই টাকা। ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নামে চেক লেখা হয়েছে। তা দিয়ে টাকা তোলা হয়েছে অথবা অন্য সহযোগী সংস্থায় সেই টাকা সরানো হয়েছে। পরে তা তুলে নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এ ভাবেই অপরাধ আড়াল করা হয়েছে। সেই মামলাতেই সন্দীপের যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও ইডি এই মামলায় সন্দীপকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখায়নি বা হেফাজতে নেয়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে এই মামলায় চার্জশিট দেয় ইডি-ও। যেহেতু সন্দীপকে ইডি হেফাজতে নেয়নি এবং চার্জশিটও দিয়ে দিয়েছে, তাই তাঁর জেলমুক্তির সম্ভাবনাই জোরালো হচ্ছে। ইডি যদি এই জামিনের বিরোধিতা করে আদালতে যায়, তবে বিষয়টা অন্য হতেও পারে।

সিবিআইয়ের মামলায় জামিন চেয়ে আগে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সন্দীপ। সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, সন্দীপের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। অভিযুক্ত ‘প্রভাবশালী’ হওয়ায় সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারেন আশঙ্কা করে সন্দীপের জামিন বাতিল করেছিল হাই কোর্ট। হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে গত ১৮ অগস্ট সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সন্দীপ।

সন্দীপের জামিনে সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আরজি করের নির্যাতিতার বাবা। তাঁর কথায়, ‘‘সিবিআই অপদার্থ সংস্থা। সেটা আরও এক বার প্রমাণ হল।’’ বিরোধীরাও একই অভিযোগ করে থাকে। আরজি করের নির্যাতিতার মা এখন পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক। তাঁর স্বামীর কণ্ঠেই শোনা গেল সিবিআই-বিরোধিতার কথা। নির্যাতিতার বাবার কথায়, ‘‘যদি বিচার না পাই, তা হলে এটা বলা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। এতে যদি দল রাগ করে, তাতে আমার কিছু করার নেই।’’

সিবিআই-কে ‘অপদার্থ’ বলে তোপ দেগেছেন আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতোও। তিনি বলেন, ‘‘এ বারের পুজো বাঙালির জন্য শুভ হল না। এই রকম লজ্জাকর পরিস্থিতি ভারতের মাটিতে দেখতে হবে, তা এক জন আন্দোলনকারী হিসেবে কল্পনা করতে পারিনি। বিচারব্যবস্থাকে দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে ফেলে দিয়ে প্রকারান্তরে দুর্নীতিবাজ, তোলাবাজ, খুনিদেরকেই সহায়তা করছে সিবিআই।’’ অনিকেতের প্রশ্ন, সিবিআই কি সন্দীপ ঘোষের মতোই দোষী নয়? আরজি কর কাণ্ডের আর এক প্রতিবাদী মুখ দেবাশিস হালদারও সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে ‘অপদার্থতার’ অভিযোগ তুললেন। তিনি বলেন, ‘‘ধর্ষণ-খুনের মূল মামলায় সিবিআইয়ের অপদার্থতার জন্য আগেই জামিন হয়ে গিয়েছিল সন্দীপ ঘোষের। দুর্নীতির এই মামলায় যে কোনও দিন জামিন হয়েই যেত। জামিন অপ্রত্যাশিত হলেও আশ্চর্যজনক নয়। দু’দিন পর হয়তো দেখব স্বাস্থ‍্য ভবন বা কোনও জায়গার প্রিন্সিপাল হয়ে ফিরে আসবেন।’’ তাঁর আরও অভিযোগ, এটা সিবিআই, বিচারব্যবস্থা এবং সরকারের ব্যর্থতা। দেবাশিসের কথায়, ‘‘যে সরকার এল, এত বড় বড় কথা বলল যে, তারা বিচার দেবে! তাদের কী ভূমিকা? সকলের ভূমিকা, সকলের সামনে উন্মোচন হয়ে গিয়েছে। সকলে ভেবেছিলেন সরকার পরিবর্তন হলে বিচার হবে, তার পরেও সেই একই জিনিস চলছে।’’

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী বলেন, ‘‘সন্দীপ ঘোষের জামিন পাওয়া মানেই তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, এমনটা মোটেই নয়। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা, এ বার হয়তো তাঁর সরকারি চাকরিতে পুনর্বহাল, মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন ফিরিয়ে দেওয়া, এমনকি পুরনো ক্ষমতার আসনে বসানোর চেষ্টাও শুরু হবে। তাঁর চারপাশে গড়ে ওঠা কথিত থ্রেট কালচার ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হয়ে উঠবে না তো? আগে যে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই ব্যবস্থা চলার অভিযোগ উঠেছিল, এ বার সেই ছত্রছায়ার রং সবুজ হবে না গেরুয়া, সেটাই দেখার। আমাদের একটাই প্রশ্ন— সরকার বদলালেও কি ব্যবস্থা বদলাবে না, আর নির্যাতিতার ন্যায়বিচারের দাবি কি এ ভাবেই অধরা থেকে যাবে?’’

অ্যাসোসিয়েশন অফ হেল্থ সার্ভিস ডক্টর্সের সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ও দুষেছেন সিবিআই-কেই। তাঁর কথায়, ‘‘লক্ষ লক্ষ মানুষের আন্দোলনকে কার্যত উপেক্ষা করছে সিবিআই! বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, ১৪৭ জনের মধ্যে ১৪০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ না-করানো এবং চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্নীতি এবং হুমকি-সংস্কৃতির শিকড়ে পৌঁছোতে ব্যর্থতা— সব মিলিয়ে ন্যায়বিচার আজ প্রশ্নের মুখে। নির্যাতিতার পরিবারের প্রতি এই অবিচার মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে এবং দোষীদের শাস্তি দিতে হবে।’’ আরজি কর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক তাপস ফ্রান্সিস বিশ্বাসেস কটাক্ষ, ‘‘পুজোর ছুটি পেল। এ বার ওয়াশিংমেশিনে ঢুকে দাগহীন পরিষ্কার হয়ে বার হবে।’’ ওয়াশিংমেশিন শব্দবন্ধ বিজেপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তৃণমূল। সন্দীপের জামিন প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সেই শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে শোনা গেল চিকিৎসক তাপসকেও। পাশাপাশি, একই প্রতিক্রিয়াতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও বিঁধেছেন তাপস। আরজি কর আবহে ২০২৪ সালের দুর্গাপুজোর আগে রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘উৎসবে ফিরুন।’’ যা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। সেই বিষয় উল্লেখ করে তাপস বলেন, ‘‘উৎসবে ফিরলেন সন্দীপ ঘোষ।’’

RG Kar Financial Irregularity Sandip Ghosh

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy