E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বাঙালির গবেষণায় অ্যালঝাইমার’স-এ নয়া দিক

‘অ্যালঝাইমার’স ডিজ়িজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে এই রোগে পৃথিবী জুড়ে আক্রান্ত হবেন প্রায় ১৫ কোটি মানুষ।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:২৭

—প্রতীকী চিত্র।

সালটা ১৯০১, নভেম্বর। স্থান ফ্রাঙ্কফুর্ট। অগুস্তে দেতেহ্ নামের এক মহিলা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তাঁর স্বামী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছেন! তাঁর মনে হতে থাকে, কারা যেন তাঁকে হত্যা করবে এ বার। মধ্যরাতে তিনি উন্মাদের মতো চিৎকার করতে থাকেন। মানসিক চিকিৎসালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তখন উপস্থিত ডক্টর আলঝাইমার স্বয়ং। চিকিৎসার প্রচেষ্টা কিন্তু কাজ দেয় না, কাতর স্বরে তিনি কেবল বলতে থাকেন, ‘আমি নিজেকে হারিয়েছি!’ অগুস্তের মৃত্যুর পরেও অ্যালঝাইমার অগুস্তের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান এবং খুঁজে পান এক অজানা রোগ।

অগুস্তের মৃত্যুর প্রায় সোয়া শতাব্দী পর ছবিটা ঠিক কেমন? ‘অ্যালঝাইমার’স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পরিসংখ্যান বলছে, নারীদের মস্তিষ্কে এই জটিল রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। কারণ খুঁজতে গবেষণা শুরু করেন কলকাতার সাহা ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজ়িক্স-এর দুই বাঙালি বিজ্ঞানী। অধ্যাপক দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে, তাঁর এবং ডক্টর সোমনাথ সেনের এই বিষয়ে গবেষণাপত্র সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে নেচার গোষ্ঠীর ‘সেল কমিউনিকেশন অ্যান্ড সিগনালিং জার্নালে’। গবেষণায় তাঁরা নারী এবং পুরুষের দেহের কোষের মধ্যের ফারাককে কাজে লাগিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন, কী ভাবে মহিলাদের মস্তিষ্কে অ্যালঝাইমার’স রোগ আণবিক স্তরেই আলাদা ভাবে ক্রিয়াশীল। এই গবেষণায় প্রথম বারের মতো একটি সম্ভাব্য আণবিক সংযোগ সূত্র উঠে এসেছে বলেই জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল। দেখা যাচ্ছে, শুধু বয়স বা অন্যান্য প্রচলিত ঝুঁকি নয়, নারী শরীরের অতিরিক্ত এক্স ক্রোমোজ়োমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। মহিলাদের কোষের অভ্যন্তরে দু’টি এক্স-ক্রোমোজ়োম থাকলেও, পুরুষের মধ্যে তা কেবল একটি। ওই অতিরিক্ত এক্স-ক্রোমোজ়োমটিই যত নষ্টের মূল বা সম্ভাব্য বিপদ বহনকারী। তার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে এক্সিস্ট নামক একটি দীর্ঘ নন-কোডিং আরএনএ। গবেষকরা দেখিয়েছেন, অ্যালঝাইমার’স আক্রান্ত মহিলাদের স্নায়ুকোষের ভিতরে এক্সিস্ট শুধু বেড়েই যায় না, আণবিক যোগসূত্রেও আনে আমূল পরিবর্তন।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়।

দেবাশিস জানাচ্ছেন, ‘‘এই রোগে এক্সিস্ট-এর স্বাভাবিক নিউক্লিয়ার ভূমিকা ব্যাহত হয়ে একটি অস্বাভাবিক অংশ সাইটোপ্লাজ়মে-এ জমা হয়। সেখানে এক্সিস্ট একটি ক্ষুদ্র, বিশেষ ধরনের আরএনএ (এমআইআর-১৮৬, যা দেহে কী ভাবে জিনগত বৈশিষ্টের প্রকাশ ঘটবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে)–কে প্রশমিত করে দেয়। যার ফলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন-এর মাত্রা ও কার্যকলাপ বদলে যায়। এই ঘটনা আলঝাইমার্স-এর প্রবণতা নারীদের মধ্যে কেন বেশি, তা বোঝার ক্ষেত্রে একটি মলিকিউলার ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছে।’’

সোমনাথ সেন।

সোমনাথ সেন।

‘অ্যালঝাইমার’স ডিজ়িজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে এই রোগে পৃথিবী জুড়ে আক্রান্ত হবেন প্রায় ১৫ কোটি মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২১-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৩-৪ কোটি মানুষ পৃথিবী জুড়ে এই রোগে আক্রান্ত। কর্কটের মতো মারণ রোগের অনেকাংশে চিকিৎসা করা সম্ভব হলেও, কোটি কোটি অ্যালঝাইমার’স রোগীর এখনও কোন উপশম নেই। ভারতেও বেড়ে চলেছে আলঝাইমার্স আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, যা আগের দশকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আনুমানিক ৫০-৬০ লক্ষ। আন্তর্জাতিক এই গবেষণাপত্রটি পথ খুলে দিতে পারে ভবিষ্যতে এই রোগের উপর গবেষণাকে (বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে) আরও এগিয়ে নিয়ে চলার— এমনটাই মনে করছে বিজ্ঞানমহল।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Medical Research NATURE Journal

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy