E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রাণের আশা ছেড়ে অপেক্ষা দেহাংশ আর মৃত্যুসংবাদের

সারদার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ছোট মেয়ে শান্তি প্রজা। বললেন, “দিদি সাইপ্রাসে চাকরি করত। জামাইবাবুর তো বছর তিনেক আগে রাসুয়ায় পোস্টিং হয়েছিল। বিদেশ থেকে ফিরে একসঙ্গে থাকবে বলেই অত দূরে, প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়েছিল।”

কুন্তক চট্টোপাধ্যায় (কাঠমান্ডু)

শেষ আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:০০

— ফাইল চিত্র।

বিদেশের চাকরি ছেড়ে মাস পাঁচেক আগে নেপালে ফিরেছিলেন সুজানি প্রজা। বিয়ের পরেও কাজের সূত্রে দূরে-দূরে থাকতেন তিনি ও স্বামী দিলবাহাদুর মগর। নেপাল পুলিশে কর্মরত দিলবাহাদুর চাকরিসূত্রে ছিলেন নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রাসুয়ায়। দেশে ফিরে রাসুয়াতেই দিলবাহাদুরের সঙ্গে সংসার-নীড় সাজিয়েছিলেন সুজানি। কাঠমান্ডুর বাপের বাড়ি অথবা শ্বশুরবাড়িতে থাকেননি।

ভোটে কোশীর বানে হারিয়েই গিয়েছেন দিলবাহাদুর ও সুজানি। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালের চত্বরে বড় মেয়ে আর জামাইয়ের ছবি দেওয়া পোস্টারে হাত বোলাতে বোলাতে মেয়ের চাকরি পাওয়া, বিদেশ থেকে ফিরে আসা, পুলিশ অফিসার জামাইয়ের কথা বলছিলেন সারদা প্রজা। কথা বলতে বলতেই চোখ উপচে জল। ধরে আসছিল গলা।

সারদার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ছোট মেয়ে শান্তি প্রজা। বললেন, “দিদি সাইপ্রাসে চাকরি করত। জামাইবাবুর তো বছর তিনেক আগে রাসুয়ায় পোস্টিং হয়েছিল। বিদেশ থেকে ফিরে একসঙ্গে থাকবে বলেই অত দূরে, প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়েছিল।” রোজই কথা হত দুই বোনের। বিপর্যয়ের আগের দিন, ২৫ অগস্ট রাতেও কথা হয়। সংসার নিয়ে হাসিঠাট্টাও হয়েছিল। তার পরের দিন সকালেই হারিয়ে গেলেন দিদি।

দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধারকাজ নিয়ে অসন্তোষ আছে শান্তির। তাঁর অভিযোগ, সেনা ও উদ্ধারকারী দল সেই ভাবে রাসুয়ায় তল্লাশি করেনি। এক সপ্তাহ পেরোনোর পরেও কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না। উদ্ধারকাজের কী অবস্থা, সেই ব্যাপারে সরকারি স্তর থেকে ঠিকমতো খবর আসছে না। ছেলে-পুত্রবধূকে খুঁজতে বিপর্যয়ের কয়েক দিন পরে উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের সাধাসাধি করে করে ধুঞ্চে পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন সুজানির শ্বশুর রাম মগর। সেখান থেকে দু’দিন ধরে হেঁটে পৌঁছন রাসুয়ায়। ছেলের আবাসন যেখানে ছিল, সেখানে পৌঁছে দেখেছিলেন, কোনও কিছুর চিহ্ন নেই। শুধু কাদা আর পেল্লায় পেল্লায় বোল্ডার। বুকে যন্ত্রণা চেপেই সে সবের ভিডিয়ো তুলে এনে ছেলের শ্বশুরবাড়ির লোকেদের দেখিয়েছেন। নিজের মোবাইলে সেই ভিডিয়ো দেখাতে দেখাতে শান্তি বলছিলেন, “এখানে কি কোনও মানুষ আর বেঁচে থাকতে পারে? আঙ্কল নিজে ওই অমানুষিক কষ্ট করে না-গেলে কি এই অবস্থার কথা জানতে পারতাম? সরকারি ক্যাম্প থেকে তো কিছুই সোজাসুজি বলছে না! আমরা তো মেনে নিয়েছি, ওরা আর বেঁচে নেই!”

শান্তিরা থাকেন কাঠমান্ডুতেই। রোজ এক বার করে শিক্ষণ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আসেন। দেওয়াল জুড়ে নিখোঁজদের ছবি দেওয়া পোস্টার সাঁটা। সেখানেই পুলিশের উর্দি পরা দিলবাহাদুর আর তাঁকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুজানির ছবিতে হাত বোলান শান্তি আর সারদা। সারদা বলছিলেন, “দেখুন, দিলবাহাদুরের কাছে গিয়ে কী খুশি হয়েছিল মেয়েটা। কপালে সুখ টিকল না!” মায়ের গলা বুজে এলে ছোট মেয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে সদ্য-পরিচিত সাংবাদিককে বলেন, “জানি তো, বেঁচে নেই। কিন্তু দেহের একটু অবশেষও কি পাব না?”

হাসপাতালের ওই দেওয়ালের সামনে স্বজন-হারানো মানুষের ভিড়। কেউ হাতে নিখোঁজের নাম-ছবির পোস্টার নিয়ে ঘুরছেন, কেউ আক্ষেপের কথা খবরের চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলছেন। নেপালে সরকারি ভাবে মৃতের সংখ্যা এখন ১২৯৫ জন, তিব্বতে ৩১। রাসুয়া বা তিমুরেতে নিখোঁজ হয়েছেন, এমন মানুষদের আত্মীয়েরা শান্তি-সারদার মতোই বুকে পাথর চেপে রূঢ় বাস্তবকে মেনে নিয়েছেন। যেমন, তিমুরেতে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে যাওয়া লোক বাহাদুর বিশ্বকর্মার ভাইঝি সুশীলা বিশ্বকর্মা অথবা রাসুয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিক বিবেক গোহরার ভাই দলবাহাদুর গোহরা মেনে নিয়েছেন, বাড়ির লোকের ফেরার আশা নেই বললেই চলে। তবুও রাতভর বাসে চেপে এসেছেন, সরকারি তরফে যদি নিশ্চিত খবরটুকু মেলে। সুসংবাদের আশা ছেড়েছেন, বরং অনন্ত দমচাপা অপেক্ষার সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাস করার বদলে এখন দুঃসংবাদটুকু পেলেও বোঝাতে পারবেন মনকে।

ছাপোষা পরিবারে খারাপ খবরটাও দরকার কাগজে-কলমে। কিশোর ছেলে আর সদ্য-তরুণী মেয়েকে নিয়ে ওই দেওয়ালের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন যশোদা থাপা। স্বামী শিবম থাপা পর্যটকদের গাড়িতে চাপিয়ে রাসুয়া নিয়ে যেতেন। শুনেছেন, পর্যটক-সহ শিবমের গাড়ি ভেসে গিয়েছে কাদা-পাথরের ভয়াল স্রোতে। যশোদা বলছিলেন, “বিমা, ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে হলে তো মৃত্যুর সরকারি শংসাপত্র দরকার! না-হলে ছেলেমেয়েকে নিয়ে কোথায় যাব?”

ওই হাসপাতাল চত্বরে জেসমিন ওঝা, নীলকণ্ঠ ঘিমিরের মতো কয়েক জন সমাজকর্মী ঘুরছিলেন। গ্রামগঞ্জ থেকে আসা, এত জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞ, স্বজন হারানো মানুষদের সাহায্য করছেন তাঁরা। ওই সমাজকর্মীরা বললেন, এত দিন পরে কাদার ভিতর থেকে অক্ষত দেহ তো মিলবে না। দেহাংশ যা পাওয়া যাবে, তা শনাক্ত করতে ডিএনএ-র নমুনা পরীক্ষা করতে হবে। এত এত দেহাংশ পরীক্ষা করতে কত যে সময় লাগবে, সেটা এখনই আঁচ করা যাচ্ছে না। আর কত দেহ তো পাওয়াই যাবে না। তাই এই মানুষদের মৃত ঘোষণার ক্ষেত্রে সরকার কী পথ বেছে নেয়, সেটাই দেখার। যত দিন না সেই পথ বেরোচ্ছে, নিখোঁজদের তো আইনের চোখে মৃত বলা যাবে না। বিমার টাকা, ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার পথে বাধা থাকবেই।

স্বজনহারার মন আর দেশের আইনের মাঝখানে তফাত গড়ছে ওই একফালি সরকারি কাগজ।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Nepal flood

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy