পোড়া গন্ধেই এখন ঘুম ভাঙে ছবি ও কবিতার দেশের। পড়ে থাকে অর্ধেকের বেশি ছাই হয়ে যাওয়া শতাব্দীপ্রাচীন টাউন হল, পোড়া গাড়ি, পোড়া ব্যারিকেড, লুট হওয়া, ছারখার দোকানপাট।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ কার্যত মেনেই নিয়েছেন, তাঁর দেশে এ ভাবে যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠবে, তা আগাম আঁচ করা যায়নি। গোয়েন্দা তথ্যেও গাফিলতি ছিল। তা সত্ত্বেও ফরাসি অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী লরাঁ নুনেজ়ের ইস্তফাপত্র গ্রহণ করেননি মাকরঁ। ফরাসি প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিজ়ে প্রাসাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নেতৃত্ব প্রয়োজন। তাই মন্ত্রী ইস্তফা দিলেও তা গ্রহণ করেননি মাকরঁ। তবে বলেছেন, কোথায় গোয়েন্দা-ব্যর্থতা ছিল, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চাই। বিক্ষোভ সামলাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে পরিচালনার নতুন কৌশলের প্রয়োজনীয়তার উপরেও জোর দিয়েছেন তিনি।
বেহাল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পড়ুয়াদের অসন্তোষ হিসেবে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, জ্বালানি-সহ জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির মতো বিষয়ের ইন্ধন পেয়ে তা আগুন হয়ে জ্বলছে ফ্রান্সে। আর ফ্রান্সের আদলেই বেলজিয়ামের ব্রাসেলস, পর্তুগালের লিসবন, ইটালির মিলানে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে বিক্ষোভকারী জনতাকে লক্ষ্য করে ছুটেছে পুলিশের রবার বুলেট। মাকরঁ এক দিকে যেমন দাঙ্গাকারীদের ‘ফল ভুগতে হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তেমনই বলেছেন, জ্বালানির দাম বেড়েছে এমন এক যুদ্ধের জেরে, যাতে ফ্রান্স আদৌ জড়িতই নয়। এই তিরের লক্ষ্য স্পষ্টতই আমেরিকা, যার প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একযোগে দায়ী করে চলেছেন ফ্রান্সের অভিবাসন নীতিকে। সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ফ্রান্স জ্বলছে। ঘৃণাভর্তি হৃদয় নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবী থেকে আসা লোকেরা একদা মহান এই দেশটাকেধ্বংস করছে।’
সীমান্ত বন্ধের পথে না-হাঁটলেও ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ ল্যকর্নু মনে করছেন, দেশে জরুরি অবস্থা জারির মতো অবস্থা রয়েছে। তবে তিনি আশাবাদী, আংশিক কার্ফুতেই সমস্যা মিটবে। এ দিনই প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপুবলিক, লে হাল এলাকার পাশাপাশি, লিল, ওয়াটিনি, দুয়ে, দেনান শহরে কার্ফু জারি হয়েছে। কড়াকড়ি হয়েছে নিস শহরেও। ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রকেরই হিসাব বলছে, রাস্তায় নেমেছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষ। ট্রেড ইউনিয়নের যদিও দাবি, সংখ্যাটা আট লক্ষ। দেশ জুড়ে গ্রেফতার প্রায় ২৪০০। হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী আহত। আগুন লাগানো, লুঠতরাজে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে। শুধু প্যারিসেই গ্রেফতার হয়েছেন ৮৫৫ জন, সাম্প্রতিক কালে যা রেকর্ড। বিক্ষোভ হয়েছে লুভ্র জাদুঘরের সামনেও। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্জি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যেন হিংসা ছড়ানো লোকেদের গুলিয়ে ফেলা না-হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের বার্তা, ‘ফ্রান্সের রাস্তায় এই হিংসা মেনে নেওয়া যায় না।’
কে-ই বা পারেন মেনে নিতে? না নির্বাচনের মুখে দাঁড়ানো প্রেসিডেন্ট, না মূল্যবৃদ্ধিতে জেরবার আমজনতা। তার পর কারা যেন আগুন জ্বালায়। পোড়া গন্ধে ঘুম ভাঙে ফ্রান্সের।