ছাত্রবিক্ষোভে পুলিশি ‘দমনপীড়ন’ ঘিরে প্রবল সমালোচনার মাঝে এ বার কিছুটা পিছু হটল ফ্রান্সের প্রশাসন। সরকারের সিদ্ধান্ত, বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের ঠেকাতে আপাতত ‘স্টান গ্রেনেড’ ব্যবহার করা যাবে না। এই মর্মে নির্দেশিকা জারি করেছেন ফরাসি কর্তৃপক্ষ। চলতি সপ্তাহেই ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষের সময়ে এক কিশোর হাত উড়ে যায়। স্টান গ্রেনেডের আঘাতেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে অভিযোগ। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স জুড়ে আরও বৃদ্ধি পায় জনরোষ। পুলিশি ‘বর্বরতার’ অভিযোগে চার দিকে সমালোচনা শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর প্রশাসনের উপরে।
ফ্রান্সের স্কুলগুলিতে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দাবিতে গত দু’সপ্তাহ ধরে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ চলছে। অভিযোগ, ন্যূনতম পরিকাঠামোটুকুও নেই বহু স্কুলে। ছাত্রবিক্ষোভের জেরে ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্ত বন্ধ রাখতে হয়েছে ৫০০-র বেশি স্কুল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির বেহাল দশা নিয়ে পড়ুয়াদের ক্ষোভ প্রশমনেরও কোনও লক্ষ্মণ আপাতত দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সের নির্বাচনের মাস ছয়েক আগে এই বিক্ষোভ অস্বস্তি বৃদ্ধি করেছে মাক্রোঁর প্রশাসনের। বৃহস্পতিবারও ফ্রান্সের বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়া, শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের সংগঠন মিছিলের ডাক দিয়েছে।
পড়ুয়াদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকার আলোচনায় বসবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকর্নু। বুধবার সন্ধ্যায় (স্থানীয় সময়ে) তিনি বলেন, পড়ুয়াদের দাবিগুলি পর্যালোচনা করে দেখবে সরকার। স্কুলভবন সংস্কার থেকে শুরু করে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের মতো দাবিগুলিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। লেকর্নুর আশ্বাস, অক্টোবরের শেষের দিকেই এ বিষয়ে সরকারের প্রস্তাব জানানো হবে। তবে এ বিষয় বিস্তারিত কোনও মন্তব্য করেননি তিনি। লেকর্নু বলেন, “অতীতে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কারণ, সেগুলি বাস্তবায়ন করার মতো ছিল না।” ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, তিনি এমন একটি সমাধান চান, যা সুনির্দিষ্ট এবং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য হবে। এবং সেখানে যাতে তহবিলের কোনও ঘাটতি না হয়, তা-ও নিশ্চিত করতে চান তিনি।
তবে লেকর্নুর আশ্বাসে বরফ গলেনি। আন্দোলনরত পড়ুয়ারা আশ্বাস নয়, কাজ দেখতে চাইছেন। এর আগে সে দেশের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন পড়ুয়ারা। কিন্তু সরকারের তরফে তাৎক্ষণিক কোনও পদক্ষেপের আশ্বাস পাননি তাঁরা। তা নিয়ে পড়ুয়াদের মনে ক্ষোভ আগে থেকেই জমে ছিল। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, বুধবার ফ্রান্সের বেশির ভাগ প্রতিবাদ কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে এর মধ্যেও প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় পুলিশ। ফ্রান্সের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং বিরোধী শিবিরের বেশ কয়েকজন নেতাও পুলিশি ‘দমনপীড়ন’ নিয়ে সরব হয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের দমাতে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
আরও পড়ুন:
দেশ জুড়ে এই বিতর্ক এবং সমালোচনার মাঝেই ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ পুলিশের জন্য নির্দেশিকা জারি করেন। জানান, বিক্ষোভকারীদের উপরে আর ‘স্টান গ্রেনেড’ ব্যবহার করা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত জানানোর সময়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময়ে এক কিশোরের হাত উড়ে যাওয়া নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। স্টান গ্রেনেড ছোড়ার ফলেই ওই অঘটন ঘটেছে বলে অভিযোগ একাংশের। সে নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও মন্ত্রী বলেন, “আসলে কী ঘটেছিল তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত পড়ুয়াদের আন্দোলনে এ সবের ব্যবহার আমরা বন্ধ করছি।”
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রি জানিয়েছেন, পড়ুয়াদের বিক্ষোভ চলাকালীন বহু স্কুলভবনে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ২৪টি হাই স্কুল এমন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলি আরও কয়েক সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হবে। উল্লেখ্য, ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএম টিভির এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৭২ শতাংশ নাগরিক পড়ুয়াদের দাবিদাওয়াগুলিকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন।