এ বারের পদার্থবিদ্যায় (ফিজিক্স) নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর নাম মঙ্গলবার ঘোষণা করল রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি। জানিয়ে দেওয়া হল, ২০২৬ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন বেলজিয়ান-মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজ়েন। দীর্ঘ ৩৪ বছর পরে আবার কোনও পদার্থবিজ্ঞানী একক ভাবে নোবেল পেলেন।
সুইডেনের নোবেল কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির রহস্যময় কণা ‘কসমিক নিউট্রিনো’ আবিষ্কারের স্বীকৃতিতেই পদার্থবিদ্যায় ফ্রান্সিস নোবেলপ্রাপ্তি। দক্ষিণ মেরুর ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজ়ারভেটরি’তে তাঁর নেতৃত্বে গবেষকদল হিমবাহের গভীরের বরফ ব্যবহার করে মহাজাগতিক নিউট্রিনোর উৎস এবং গতিপথ চিহ্নিত করতে সফল হয়েছেন। বস্তুত, ১৯৮৮ সালে তিনি প্রথম একটি গবেষণাপত্রে দাবি করেছিলেন যে, দক্ষিণ মেরুর হিমবাহের বরফকে কাজে লাগিয়ে মহাজাগতিক নিউট্রিনোর গতিপথের সন্ধান করা সম্ভব। সেই ধারণা অনুসরণ করে গবেষণায় এই সাফল্য নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন সুইডিশ নোবেল কর্তৃপক্ষ।
প্রসঙ্গত, কোনও পদার্থের সঙ্গে নিউট্রিনোর কোনও রকম ‘লেনাদেনা’ নেই। ফলে তাদের চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। প্রতি মুহূর্তে সৌর জগতের বাইরে থেকে আসা কয়েক লক্ষ কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে। আমরা জানতেও পারছি না। এই কারণে তাদের অনেক সময়ই ‘ভূতুড়ে কণা’ বলা হয়। নিউট্রিনোদের এই যে চিহ্নিত করা কঠিন, সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় উপযোগিতা। কারণ, শক্তিশালী নিউট্রিনোরা তাদের শক্তিক্ষয় না করে এবং ‘বিপথগামী’ না হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। সঙ্গে করে নিয়ে আসে তাদের উৎপত্তিস্থলের মহাজাগতিক তথ্যসমূহ। ফলে তাদের গতিপথের সন্ধান করতে পারলে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে তাদের মহাজাগতিক উৎসেরও হাঁড়ির খবর পাওয়া সম্ভব।
মহাজাগতিক নিউট্রিনো হল এমন এক রহস্যময় কণা, যার কোনও বৈদ্যুতিক আয়ন নেই এবং ভর শূন্যের কাছাকাছি। ফলে এরা প্রায় কোনও কিছুর সঙ্গে ধাক্কা না-খেয়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিয়ে মহাজাগতিক বস্তু (যেমন, ব্ল্যাক হোল বা সুপারনোভা) থেকে সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। এদের শনাক্ত করতে এমন একটি মাধ্যমের প্রয়োজন, যা স্বচ্ছ এবং ঘন অন্ধকারে ঢাকা। দক্ষিণ মেরুর প্রায় আড়াই কিলোমিটার গভীরের বরফ এই কাজের জন্য আদর্শ। কারণ, প্রচণ্ড চাপে সেখানে কোনও বাতাসের বুদবুদ থাকে না এবং তা কাচের চেয়েও স্বচ্ছ। ফ্রান্সিসের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ মেরুর হিমবাহের বরফে গভীর গর্ত তৈরি করেন। বরফের ১.৪৫ কিলোমিটার থেকে ২.৪৫ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত মোট ৮৬টি লম্বা তার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
এর পরে ওই ৮৬টি তারের সঙ্গে যুক্ত করা হয় ৫,১৬০টি অতি সংবেদনশীল আলোক সেন্সর, যেগুলোকে বলা হয় ‘ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল’ (ডম)। এই পুরো ব্যবস্থাটি বরফের নীচে ১ কিউবিক কিলোমিটার (১০০ কোটি ঘনমিটার) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা পৃথিবীর বৃহত্তম নিউট্রিনো ডিটেক্টর। মহাকাশ থেকে আসা কোটি কোটি নিউট্রিনো কোনও বাধা ছাড়াই পৃথিবী এবং এই বরফ ভেদ করে চলে যায়। কিন্তু অত্যন্ত বিরল কিছু ক্ষেত্রে, একটি উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো বরফের ভেতরের জলের পরমাণুর (অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস) সঙ্গে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষের ফলে ‘মিউয়ন’ নামক এক ধরনের দ্রুত গতির চার্জযুক্ত কণা তৈরি হয়। মিউয়ন যখন বরফের মধ্য দিয়ে আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটে যায়, তখন একটি নীল রঙের আলোর ঝলকানি তৈরি হয়। পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে ‘চেরেঙ্কভ বিকিরণ’ বলা হয়। ফ্রান্সিসদের বসানো ‘ডম’ সেই বিকিরণ থেকেই চিহ্নিত করেছে মহাজাগতিক নিউট্রিনোকে।ফ্রান্সিসের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৩ মার্চ, বেলজিয়ামের তিয়েনে। ৮২ বছর বয়সি পদার্থবিজ্ঞানী বর্তমানে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনার (প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা) পাবেন।