জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে তীব্র জনরোষের আগুনে পুড়ছে ফ্রান্সের প্রতিবেশী ইটালিও। রবিবার থেকে ইটালির একাধিক শহরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত হিংসার রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সোমবার (১৯ অক্টোবর, ২০২৬) ইটালিতে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করল রোমের ভারতীয় দূতাবাস।
সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা এক নির্দেশিকায় দূতাবাস জানিয়েছে, গত সপ্তাহ থেকেই ইটালির একাধিক শহরে বিক্ষোভ ও পথসভা চলছে। ভারতীয় নাগরিকদের উদ্দেশে দূতাবাসের তরফে বলা হয়েছে, “আমরা ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকার, ভিড় এলাকা এবং যে সব স্থানে বিক্ষোভ হচ্ছে তা এড়িয়ে চলার এবং এই সংক্রান্ত স্থানীয় খবরাখবরের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিচ্ছি।”
যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য দূতাবাস দু’টি বিশেষ হেল্পলাইন নম্বরও প্রকাশ করেছে। ইটালিতে থাকা ভারতীয় নাগরিকেরা প্রয়োজনে রোমের ভারতীয় দূতাবাস অফিসে +৩৯ ৩৩১ ৬১৪ ২০৮৫ নম্বরে এবং মিলানের কনস্যুলেট জেনারেল অফিসে +৩৯ ৩৮৮১৬৪৭৫২৭ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।
রবিবার একাধিক শহরে শান্তিপূর্ণ ভাবে বিক্ষোভ শুরু হলেও মিলানে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। একদল উন্মত্ত বিক্ষোভকারী পুলিশের সঙ্গে সরাসরি খণ্ডযুদ্ধে লিপ্ত হয়, একের পর এক দোকানে লুটপাট চালায় এবং বিভিন্ন সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়। ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী আহত হন। আন্দোলনকারীদের মিছিলটি মাঝপথেই আটকে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে, মিলানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিলাসবহুল শপিং এলাকা ‘ভিয়া মন্টেনাপোলিওনে’-র ‘শ্যানেল’, ‘টিফানি’ এবং ‘ডিওর’-এর মতো নামী ব্র্যান্ডগুলি দোকান থেকে তাদের সামগ্রী সরিয়ে নেয়। ‘ডেকাথলন’, ‘আর্কিটেরিক্স’ এবং ভোডাফোনের মতো সংস্থায় ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। আতঙ্কে ‘লেভিস’ এবং ‘আন্ডার আর্মর’-এর মতো ব্র্যান্ড কার্ডবোর্ড ও কাঠ দিয়ে দোকানের কাচ ঢেকে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইটালির উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি সোমবার সমাজমাধ্যমে জানান, মিলানকে রক্ষা করতে ৫০০ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, রবিবার মিলানের অশান্তির ঘটনায় ২৭১ জন যুবককে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৩ জন নাবালক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক। এ ছাড়া, শনিবার উত্তরাঞ্চলীয় শহর বোলোনিয়া, ব্রেসিয়া, বেরগামো এবং তুরিনেও ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, সেখান থেকে আরও ২৮ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তুরিন শহরে হাতুড়ি ও পাথরের টুকরো নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের আটক করা হয়েছে। অন্য দিকে, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বলোনিয়া শহরের একটি রেলওয়ে স্টেশন সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।
আরও পড়ুন:
এই হিংসার তীব্র নিন্দা করেছেন ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। রবিবার এক্স হ্যান্ডেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “বিক্ষোভ প্রদর্শন একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু আমাদের শহর জ্বালিয়ে দেওয়া কোনও অধিকারে পড়ে না।” সোমবার তিনি মন্ত্রী ও নিরাপত্তা আধিকারিকদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠকও করেন।
অন্যতম উপ-প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের ওপর এই হামলার কড়া জবাব দেওয়া হবে। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি বিশেষ নিরাপত্তা প্যাকেজ অনুমোদনের কথা রয়েছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, মূলত নাবালক ও যুব গ্যাংগুলির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা নিবর্তনমূলক আটকের মেয়াদ বাড়ানোর কথা ভাবছে মেলোনি সরকার।
মেলোনি আরও বলেন, “আজকে যে হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ ভাবে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। যে মতাদর্শের জন্যেই বিক্ষোভ হোক না কেন, মানুষের অংশগ্রহণই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের ভিত্তি।” তবে হিংসার রাজনীতি বন্ধ করার জন্য তিনি বিরোধীদের কাছেও আর্জি জানান। বিরোধীরা যেন কোনও রকম দ্বিধা না রেখে এই হিংসাত্মক ঘটনার তীব্র নিন্দা করে এবং যে কোনও গণআন্দোলন শান্তিপূর্ণ রাখার প্রকাশ্য বার্তা দেয়, সেই আহ্বানও জানিয়েছেন ইটালীয় প্রধানমন্ত্রী।