ঠিক তিন দশক আগে নেপালে এসেছিলেন তিনি। সে বার অন্নপূর্ণা ট্রেকে গিয়ে প্রবল তুষারপাতের মধ্যে পড়েছিলেন। তবে বড় বিপদ হয়নি। সঙ্গে থাকা বন্ধুকে নিয়ে শুধু ট্রেক শেষ করে ফিরে আসতে হয়েছিল স্তেফানে ল্য বেরকে। এ বার অবশ্য অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। নেপালের চিতওয়ানে বেড়াতে গিয়ে কার্যত কান ছুঁয়ে বেরিয়ে গিয়েছে হড়পা বান। কাঠমান্ডুর হোটেলে বসে সেই অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন পেশায় বিচারক স্তেফানে।
আদতে ফরাসি। থাকেন ফ্রেঞ্চ গায়ানায়। বিচারকের পেশায় নিযুক্ত ঊনষাট বছরের স্তেফানে। ছ’ফুটেরও বেশি লম্বা, পেটানো চেহারার এই ফরাসি সাহেব সর্বদাই হাসিখুশি। হোটেলের তরুণী রিসেপসনিস্টকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। সেই কথোপকথন থেকেই আলাপ এবং তার পরেই ঝুলি থেকে বার করলেন বন্যা দেখার অভিজ্ঞতা।
একা ঘোরেন বিচারক সাহেব। নেশা পাহাড়ে বেড়ানো। প্রচণ্ড আগ্রহ বৌদ্ধ ধর্মে। বেশ কয়েক বার দার্জিলিং, সিকিম ঘুরে গিয়েছেন। পাহাড় এবং বৌদ্ধ ধর্ম, এই দুয়ের জন্য এ বার নেপালে আসা। ঠিক করেছিলেন, চিতওয়ান ঘুরে তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের নিং মা শাখার অন্যতম প্রাচীন ক্ষেত্র মুস্টাংয়ে যাবেন। সেই মতো গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়েছিলেন। স্তেফানে বলছিলেন, “গাড়ি চালানোর সময় বার বার ড্রাইভারের স্ত্রীর ফোন আসছিল। গাড়ি চালানোর জন্য ধরতে পারেনি। কিন্তু বার বার ফোন আসছে দেখে, ওকে গাড়ি থামিয়ে ধরতে বলি। সেই সময়ে দেখি পুলিশ মাইকে কিছু একটা ঘোষণা করছে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি একটা পাথরের আড়ালে রেখে আমরা দুজনে একটু উঁচু জায়গায় উঠে যাই। চোখের সামনে দেখলাম কাদাজলের স্রোত সামনে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল।”
বলতে বলতে নিজের হাত তুলে দেখান তিনি। প্রকৃতির ওই রুদ্র রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই রোম খাড়া হয়ে যায় সাহেবের। বলছেন, “কয়েক মিনিটের মধ্যে চোখের সামনে যা কিছু ছিল, সব যেন সাফ হয়ে গেল। গাড়ির ড্রাইভার দেখি, থরথর করে কাঁপছে!’’ পরে জানতে পেরেছিলেন, তাঁর চালকের গ্রামের কাছেও ওই একই ঘটনা ঘটেছে। তবে বাড়ি নদী থেকে অনেকটা উঁচুতে হওয়ায় সব বেঁচে গিয়েছে। সেই খবর জানাতেই ফোন করেছিলেন চালকের স্ত্রী। স্তেফানে বলছেন, “বার বার ফোন আসায় সন্দেহ হয়েছিল, বিপদ হল কি না। কিন্তু এমন ঘটনা হবে, কল্পনা করতে পারিনি। আর একটু এগিয়ে গেলে কী হত, তাই ভাবছি!”
রাস্তা সব ভেঙে যাওয়ায় বেড়ানো বাতিল হয় স্তেফানের। গাড়ি নিয়ে বহু ঘুরপথে ফিরতে হয়েছে কাঠমান্ডুতে। তবে আক্ষেপ নেই। বলছেন, “শুধু বৌদ্ধধর্মের টানেই নেপালে আসব।” বাম হাতে বুদ্ধের ট্যাটুও করিয়েছেন। সেটাও দেখালেন। বললেন, “আর তিন বছর পরে বাষট্টি। ব্যস, চাকরি থেকে ছুটি।” ইচ্ছে ছিল, অবসরের পর নেপালে থানা গাড়বেন স্তেফানে। কিন্তু চোখ টিপে বললেন, “আমার স্ত্রী ডমিনিকান রিপাবলিকের বাসিন্দা। অবসরের পরে মনে হয়, দেশেই নিয়ে যাবে ও। তবে নেপালে তো আবার আসবই।”