নদীর প্রবল গর্জন শুনেই আর দেরি করেননি। স্ত্রীর হাত ধরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের জঙ্গলের দিকে ছুটেছিলেন কেশর বাহাদুর পোখরেল। নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর খেয়ালে গোয়ালে দড়িবাঁধা মোষ আর তার পাঁচ দিনের শাবকের কথা মাথায় আসেনি। হিমবাহ ধসে আসা হড়পা বানে গোয়ালে বাঁধা ‘মা আর মেয়ে’ কোথায় ভেসে গিয়েছে, কেউ জানে না। কেশরের বাড়ির ছাদ আর তার সিঁড়িটুকু কাদার উপরে জেগেরয়েছে শুধু।
কেশরদের গ্রামের নাম ভইসে। ভোটে কোশী নদীর পাড়ে ত্রিশূলী ও বেত্রবতীর মাঝে ছোট্ট এক টুকরো জনপদ। একটু ভুল হল। বলা উচিত, গ্রামের নাম ‘ছিল’ ভইসে। যা ‘ছিল’ এক টুকরো জনপদ। আজ সব কিছুই পাহাড় বেয়ে নেমে আসাপলির তলায়।
সে দিনের পর থেকে মধ্য পঞ্চাশের কেশর বাহাদুর রোজ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে স্কুলের আশ্রয় শিবির থেকে চাপা পড়া গ্রামের সীমানা পর্যন্ত আসেন। ডুবে যাওয়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন। কখনও কাদায় নেমে বাড়ির ধ্বংসস্তূপ হাতড়ান। কী খোঁজেন, কেউ জানে না।
ভোটে কোশীর কাদা ঠেলে হাঁটতে হাঁটতেই আলাপ হল কেশর বাহাদুরের সঙ্গে। নদীর ধার ঘেঁষে বসে ছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় পেতেই হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন এক সময়ের সম্পত্তি, মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের দিকে। বলছিলেন, “চাষবাস করে সংসার চলত। এক সময়ে চাকরি করতাম। আয় মন্দ হত না। কিন্তু পোষাল না। চাকরি ছেড়ে চাষবাস শুরু করলাম। কাঠমান্ডুর পাট চুকিয়ে এখানে এসে থাকা শুরু করলাম।” বলতে বলতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিলেন কেশর। কিন্তু সে দিনের কথা বলতে গিয়ে শিউরে উঠলেন। বললেন, “কিছু মাথায় ছিল না। শুধু মনে আছে, বৌয়ের হাত ধরে দৌড় দিয়েছিলাম। হাঁচড়পাঁচড় করে উপরের জঙ্গলে পৌঁছে তাকিয়ে দেখি, নীচ দিয়ে মহাপ্রলয় বয়ে যাচ্ছে! ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আমার ভিটে-বাড়ি, তিলে তিলে সঞ্চিত সব কিছু।” বার বার বলছিলেন, “তিন মেয়ে, এক ছেলে পড়াশোনার জন্য কাঠমান্ডুতে থাকে। ওরা বাড়িতে থাকলে কি বাঁচাতে পারতাম?”
কেশরদের ওই গ্রামে অধিকাংশের পদবি পোখরেল। কাছে-দূরের জ্ঞাতি। সবার ভাগ্য অবশ্য কেশর বাহাদুরের মতো নয়। একাধিক পরিবার হারিয়ে গিয়েছে। জলের স্রোতে ভেসে গিয়েছেন, না কি পলল-সমাধি ঘটেছে, কেউ জানে না। নদীর পারেই গালে হাত দিয়ে বসেছিলেন বৈদ্যনাথ পোখরেল, কেশর বাহাদুরের দূর সম্পর্কের ভাই। গ্রামের সম্পন্ন বাসিন্দা বৈদ্যনাথের দোতলা বাড়ি ছিল, নদীর ধারে রমরম করে চলা ধাবা ছিল। বাড়ির ধ্বংসস্তূপ আছে, ধাবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন। স্ত্রী, দুই ছেলে প্রাণে বেঁচে গেলেও বৈদ্যনাথের বৃদ্ধা ঠাকুমা, প্রৌঢ়া কাকিমা জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছেন। দুই ভাইয়েরও কোনও খোঁজ নেই। “বসে আছি, যদি কাদা সরিয়ে কিছু বেরোয়!”, শান্ত গলায় বলেন বৈদ্যনাথ।
বিপর্যয়ের ধাক্কা বোধ হয় সহোদরের মৃত্যুর থেকেও জোরালো।