E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

লন্ডনের দুর্গাপুজোয় বহুবর্ণের ছটা

লন্ডনের দুর্গোৎসবের আর এক পরিচিত মুখ বেঙ্গলি কালচারাল অ্যান্ড সোশ্যাল ক্লাবের চিকিৎসকদের উদ্যোগে শুরু হওয়া পুজো। স্বামীনারায়ণ স্পোর্টস ওয়ার্ল্ডের প্লেহল রোডে আয়োজিত এই উৎসবের দায়িত্ব এখন অনেকটাই এসে পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে।

সীমানা পাল, সুমনা আদক (লন্ডন)

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৩২

—প্রতীকী চিত্র।

ছ’দশকের ঐতিহ্য থেকে নতুন প্রজন্মের উদ্যোগ— লন্ডনের দুর্গোৎসব আজ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, প্রবাসী বাঙালির সংস্কৃতি, স্মৃতি ও একসঙ্গে থাকার উদ্‌যাপন।

লন্ডনের দুর্গাপুজোর ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৬৩ সালে কয়েক জন তরুণ বাঙালি ছাত্রের উদ্যোগে শুরু হয় লন্ডন দুর্গাপুজো দশেরা অ্যাসোসিয়েশনের হ্যাম্পস্টেড ও বেলসাইজ পার্কের পুজো। একই বছরে পথচলা শুরু ক্যামডেন দুর্গাপুজোরও। পূর্ব লন্ডনে বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ১৯৭৫ সালে স্ট্র্যাটফোর্ডে শুরু হয় আর এক পুজো। পরবর্তী দশকগুলিতে শহরের নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে আরও বহু পুজো। প্রতিটি উদ্যোগের ইতিহাস আলাদা, কিন্তু তাদের এক সূত্রে বেঁধেছে বাঙালির শিকড়ের টান।

এই ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ক্যামডেন দুর্গাপুজো। ২০২৬ সালে ৬৪ বছরে পা দিয়েছে এই আয়োজন। প্রতি শরতে সুইস কটেজ লাইব্রেরি হয়ে ওঠে এক টুকরো বাংলা। বোধন থেকে অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, কুমারীপুজো, সিঁদুর খেলা— প্রতিটি আচারেই ধরা পড়ে ঐতিহ্যের প্রতি নিষ্ঠা। এ বছরের ভাবনায় রয়েছে ‘দুর্গেশনন্দিনী’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্টির অনুপ্রেরণায় নারীসত্তা, তার পূর্ণতা ও শক্তিকে প্রতীকী ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা।

দক্ষিণ লন্ডনে উইম্বলডন কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজো এ বছর ২০তম বর্ষ উদ্‌যাপন করছে। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ প্রবাসী বাঙালিদের এক প্রাণের উৎসব। ‘পুজোর আনন্দ, সবার সাথে’— এই ভাবনাকে সামনে রেখে ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচি নাচ, অঞ্জলি, ভোগ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আড্ডায় তৈরি হয় এক টুকরো বাংলা। বাঙালির পাশাপাশি নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষও শামিল হন এই উৎসবে। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়াও সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য। গত বছর পুজোয় দু’হাজারেরও বেশি মানুষের সমাগম হয়েছিল।

লন্ডনের দুর্গোৎসবের আর এক পরিচিত মুখ বেঙ্গলি কালচারাল অ্যান্ড সোশ্যাল ক্লাবের চিকিৎসকদের উদ্যোগে শুরু হওয়া পুজো। স্বামীনারায়ণ স্পোর্টস ওয়ার্ল্ডের প্লেহল রোডে আয়োজিত এই উৎসবের দায়িত্ব এখন অনেকটাই এসে পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। পুজো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মিলনমেলা ও খাওয়াদাওয়াকে ঘিরে তৈরি হয় এক আন্তরিক পারিবারিক পরিবেশ। প্রবাসে প্রজন্মান্তরে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এমন উদ্যোগের গুরুত্বও কম নয়।

স্লাউয়ের ‘আড্ডা স্লাউ’-এর পুজোতেও নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে উৎসবের মেজাজ। স্লাউ ক্রিকেট ক্লাবের মাঠে আয়োজিত এই পুজো স্থানীয় বাঙালিদের মিলনক্ষেত্র। নীলোৎপল মণ্ডল-সহ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে এখানে অঞ্জলির পাশাপাশি গুরুত্ব পায় বন্ধুত্ব, পারিবারিক জমায়েত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং খাওয়াদাওয়া। দুর্গাপুজো যে শুধু মণ্ডপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ, এই আয়োজন তারই প্রমাণ।

এ বছর দশ বছরে পা দিয়েছে আদিশক্তি দুর্গাপুজো। কলকাতার পাড়ার পুজোর মতো এখানে হয়তো নেই রাস্তার ধারের ফুচকার দোকান, রাতভর ঠাকুর দেখার ভিড় বা পাড়ার মোড়ের আড্ডা। কিন্তু রয়েছে এক অন্য রকম আন্তরিকতা। এক দশকে আদিশক্তি একটি পুজোর গণ্ডি পেরিয়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব কমিউনিটি। বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি গরবা, ডান্ডিয়ার মতো ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও এখানে জায়গা করে নিয়েছে। আবার ২০২৬ সালে নতুন সংযোজন ‘আবাহন’। বিগ বং কানেকশন লন্ডনের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই পুজো প্রথম বছরেই ছোট পরিসরে হলেও নিজের পরিচয় গড়ে তোলার পথে।

তবে লন্ডনের দুর্গাপুজোর বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের কথা উঠলে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয় বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের আয়োজনের কথা। গানার্সবেরি পার্কের বিস্তীর্ণ পরিসরে এই পুজো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গান, সাহিত্য, নাটক, শিল্প ও বিনোদনের এক বৃহৎ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। এ বছরের আয়োজনে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে আকাশবাণীর শতবর্ষ। যে বেতারের সুরে একসময় বাঙালির দুর্গাপুজোর সকাল শুরু হতো ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনে, সেই স্মৃতিকে বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে এই ভাবনায়।

সব মিলিয়ে লন্ডনের দুর্গাপুজোর ছবিটি একরঙা নয়, বহুবর্ণ। এই বৈচিত্রের মধ্যেই রয়েছে প্রবাসের দুর্গোৎসবের আসল শক্তি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja London

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy