E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কে জানে ডুবে আছে কত জন

সরকারি হিসাবে নেপালে হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা আজ বেড়ে হয়েছে ১০৫০। ৫৮৩ জন বিদেশি ও ৮৩ জন নিরাপত্তাকর্মী-সহ নিখোঁজ প্রায় চার হাজার জন।

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:০৭
কাদাগোলা জল গর্জন করতে করতে পাক খাচ্ছে।

কাদাগোলা জল গর্জন করতে করতে পাক খাচ্ছে। — ফাইল চিত্র।

দু’পা হাঁটতেই আচমকা পা ঢুকে গেল কাদায়। পচা গন্ধ এসে নাকে ঢুকতেই গোটা শরীর যেন গুলিয়ে উঠল। এ দিকে কাদায় প্রায় হাঁটু পর্যন্ত গেঁথে থাকায় পা নাড়ানোরও উপায় নেই। বিপদ দেখে তড়িঘড়ি টেনে তুললেন এক নেপালি যুবক। চোখ-মুখ দেখে বুঝতে পেরেছেন, দুর্গন্ধে টিকতে পারছি না। হিন্দি-নেপালি মিশিয়ে বললেন , ‘‘মানুষপচা গন্ধ। এই কাদার তলায় কত লোক যে ডুবে আছে, কেউ জানে না!’’

সরকারি হিসাবে নেপালে হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা আজ বেড়ে হয়েছে ১০৫০। ৫৮৩ জন বিদেশি ও ৮৩ জন নিরাপত্তাকর্মী-সহ নিখোঁজ প্রায় চার হাজার জন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানাচ্ছে, উদ্ধার হয়েছেন ১৬৩জন ভারতীয়।

একটু দূর দিয়ে বয়ে চলেছে ভোটে কোশী। কাদাগোলা জল গর্জন করতে করতে পাক খাচ্ছে। উথাল-পাথাল স্রোত দেখে বোঝা যায়, ঠিক সাত দিন আগে নদীর চেহারা কী ছিল! এখনও নদীর চেহারা দেখলে রীতিমতো কাঁপুুনি ধরছে। জলের স্রোতের শব্দে আশেপাশের কথাও ঠিকমতো শোনা দায়। এ অবশ্য ততটা অস্বস্তিকর নয়, যতটা পাঁকের তলা থেকে উঠে আসা মানুষপচা গন্ধটা।

কাঠমান্ডু থেকে ত্রিশূলীর দূরত্ব গাড়িতে ঘণ্টা তিনেক। ত্রিশূলীর কয়েক কিলোমিটার আগে বিদুর বাজার দেখেও বিপর্যয় আঁচ করা যায় না। লোকজন হেঁটে-চলে বাজার করছে। দিব্যি শান্ত, পাহাড়ি গঞ্জ জীবন। কিন্তু সেনা ছাউনি ছাড়িয়ে ত্রিশূলী বাজারে ঢুকতেই ছবিটা আগাপাশতলা বদলে যায়। কে বলবে, এটা নেপালের নুয়াকোট জেলার অন্যতম বড় বাণিজ্য কেন্দ্র, বেত্রবতীর উত্তর গয়া বা তিব্বতের মান সরোবর যাওয়ার পথে তীর্থযাত্রীদের জিরিয়ে নেওয়ার জায়গা। রাস্তা অবশিষ্ট নেই। বাড়িগুলোকে কেউ যেন খেলনার মতো দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে। নদীর তোড়ে ধুয়েমুছে গিয়েছে বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেনাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু অসহায় মুখ। ওই যাঁরা বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছেন।

ত্রিশূলী থেকেই নদীর ধার ঘেঁষে রাস্তা চলে যেত। ভইসে হয়ে সাঁকো পেরিয়ে বেত্রবতী। তার পর আবার সাঁকো পেরিয়ে রাসুয়ার রাস্তা। এক দিকে দোকানবাজার, ধাবা ছিল। অন্য দিকে বসতি। ২৬ অগস্ট তিব্বতের পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফগলা জল, কাদা, পাথরের স্রোত সে সব নিয়ে গিয়েছে। নদীর জল একটু সরেছে। জেগে রয়েছে পাথর, পলি বিছোনো চর। সেই পলির তলায় চিরতরে হারিয়ে গিয়েছেন বহু মানুষ, যাঁদের মাংসপচা গন্ধটা বাতাস ভারী করে তুলছে।

কাদা থেকে পা তুলে নিয়ে সরে দাঁড়াই। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে যুবক পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। কাদায় পা গেঁথে যায় না ঠিকই, কিন্তু আচমকা হোঁচট খাই। লোহার শিক বেরিয়ে আছে! পথপ্রদর্শক নিস্পৃহ গলায় বলেন, ‘‘আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তার তলায় কারও বাড়ির ছাদ। ওই ছাদেরই শিক।’’ চারদিকে ভাল করে নজর করতেই দেখি, এক নয়, একাধিক ছাদের অস্তিত্ব বোঝা যায় পলির তলায়। এই বাড়িগুলোর লোকেরা কি বাঁচতে পেরেছেন? স্থানীয় পথপ্রদর্শকের কাছেও উত্তর নেই। তবে একটু দূরে, পলি থেকে মাথা বার করে রাখা একটা কংক্রিটের থামের অংশ দেখিয়ে বলেন, ‘‘ওই বাড়িতে পাঁচ জন ছিল। কেউ বেরোতে পারেনি। আমার কাকার বাড়ি ছিল ওটা।’’ একটু থেমে যোগ করলেন, ‘‘আমার বাড়িও তলিয়ে গিয়েছে। তবে প্রাণে বেঁচে গিয়েছি।’’

একের পর এক বাড়ি কাদায় গেঁথে গিয়েছে। কোথাও স্মৃতি হিসেবে বাড়ির বিদ্যুতের তার অথবা ছাদের জলের পাইপ মাথা তুলে আছে। কোথাও দোতলাটুকু খণ্ডহরের মতো জেগে। রান্নাঘরে পড়ে আছে চালডালের দানা, ছাদের তারে এখনও সেঁটে রয়েছে পোশাকের অংশ। কোথাও কোথাও ছড়িয়ে আছে ঘর-গেরস্থালির জিনিসপত্র। ভাঙা মগ, বিস্কুটের টিনের কৌটো। নদীর ও-পারেও সেই একের পর এক খণ্ডহর। এ দিক-সে দিক খোঁজ করছে উদ্ধারকারী দল। পে-লোডার দিয়ে পলি কাটা হচ্ছে। গত কালও কয়েক জনের দেহ উঠেছে। একটা হাত বা পায়ের পাতা— ওটুকু পেলেও হয়তো স্বজনহারার শান্তি। উদ্ধারকারী দলের কর্মীরাই বলছিলেন, এই বিরাট পলি সরিয়ে সব দেহ বার করা কার্যত অসম্ভব। অন্তত দেহাংশের ডিএনএ মিলিয়েও যদি কাউকে কাউকে শনাক্ত করা যায়, সেই লক্ষ্যে নেপালকে সাহায্য করছেন ভারত থেকে যাওয়া ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা। ভারতীয় উদ্ধারকারীরা নেপালি সেনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ঢুকছেন প্রাণের সন্ধানে।

ত্রিশূলী থেকে ভোটে কোশীর ধার ধরে হেঁটে প্রায় এক ঘণ্টা যাওয়ার পরে পড়ল ভইসে। তীর্থযাত্রার পথে এ-ও এক জিরিয়ে নেওয়ার জায়গা ছিল। কিন্তু সে গ্রাম আর নেই। পুরো গ্রামই নদী গিলে নিয়েছে। পড়ে আছে শুধু টুকরো বাড়ি, টুকরো সংসারের চিহ্ন। কোথাও পড়ে ট্রেকিংয়ের জুতো। তার পাশে মরা মোষ। তার রক্ত পলির উপরে শুকিয়ে আছে। এ সব পেরিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। ভইসের শেষ প্রান্তে গিয়ে রাস্তা প্রায় শেষ। একটা দোতলা বাড়ি। কেউ নেই। একতলার ঘরের ভিতরে হাঁটু পর্যন্ত পলি-পাথর। উঠোনে আমগাছ, পেয়ারা গাছ। ডালে-ডালে পেয়ারা। কয়েকটা পেকেছে। কিন্তু যাঁদের গাছ তাঁরা কোথায়?

হয়তো আশ্রয় শিবিরে, নয়তো...।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Nepal flood

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy