মাঝ-আকাশে ককপিটের মধ্যে সহকর্মীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছর। তার পরেও বিমানের রাশ ছাড়েননি তিনি। নিরাপদে বিমানটিকে অবতরণ করিয়েছেন। ‘ফ্লাইদুবাই’ সংস্থার বিমানের এই ঘটনায় ওই পাইলটের সাহসিকতায় মুগ্ধ রাষ্ট্রপ্রধানেরা।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই থেকে ইজ়রায়েলের তেল আভিভের দিকে যাওয়া ওই বিমানে ১৮০ জন যাত্রী ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ইজ়রায়েলের নাগরিক। ‘ফ্লাইদুবাই’-এর বিমানে হওয়া এই ঘটনাটিকে বুধবারই সন্ত্রাসবাদী হানা বলে দাবি করেছিল ইজ়রায়েল। তার পর সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে পাইলট স্মিতের সাহসিকতার প্রশংসা করেন ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রায় একই ভাবে স্মিতের প্রশংসা করে তাঁকে ‘নায়ক’ বলে সম্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদী লেখেন, “ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর একজন নায়ক। ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে গুরুতর ভাবে জখম হয়েও তিনি অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন। অন্যদের প্রাণরক্ষার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি।” মোদী জানান, স্মিতের সাহসিকতার জন্যই কয়েকশো মানুষ বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। স্মিতের দ্রুত আরোগ্য কামনাও করেছেন মোদী। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু জানিয়েছেন, স্মিতের জন্য গোটা দেশ গর্বিত।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও। বুধবার হোয়াইট হাউসে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “পাইলট খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন। আমার মনে হয় তিনি এখনও খুব খারাপ অবস্থায় আছেন। আশ্চর্যজনক ভাবে তিনি বিচারবুদ্ধি হারাননি। তিনি একজন নায়ক।” তবে যে সহ-পাইলট স্মিতকে কুপিয়েছেন বলে অভিযোগ, তিনি সন্ত্রাসবাদী কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত নন ট্রাম্প। আক্রান্ত হয়েও স্মিত কী ভাবে বিমানযাত্রীদের জীবনরক্ষা করেছেন, সংক্ষিপ্ত আকারে তা তুলে ধরেন নেতানিয়াহু। ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী লেখেন, “ছুরিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর ভাবে জখম হওয়া সত্ত্বেও উনি লড়ে গিয়েছিলেন। হামলা আটকানোর চেষ্টা করেন, ককপিটের দরজা খুলে দেন। এর ফলে যাত্রী এবং বিমানকর্মীরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকাতে পেরেছিলেন। মাঝ-আকাশে একটা বড় রকমের বিপর্যয় এই ভাবেই এড়ানো সম্ভব হয়েছে।” বিমানে থাকা ১৮০ জনের জীবন বাঁচানোর কৃতিত্ব ভারতীয় পাইলটকে দিয়ে নেতানিয়াহু লেখেন, “অসাধারণ সাহসিকতার জন্য আমি স্মিত মচ্ছরকে অভিবাদন জানাচ্ছি। ওঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।”
বুধবার সকালে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজ়েড১০৭৩ বিমানটি চালাচ্ছিলেন স্মিত। অভিযোগ, মাঝ-আকাশে ককপিটের মধ্যেই তাঁর উপর হামলা হয়। স্মিতকে কোপানো হয় ছুরি দিয়ে। তাঁর সহকারী পাইলট এই আক্রমণ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। বিমানে উপস্থিত যাত্রী এবং অন্য বিমানকর্মীরা হামলাকারীকে বাধা দেন এবং ক্যাপ্টেনকে উদ্ধার করেন। ১৮০ জন যাত্রী-সহ বিমানটিকে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমে, তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। হামলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্মিত আপাতত সৌদির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সৌদির ভারতীয় দূতাবাসের তরফে বৃহস্পতিবার জানানো হয়েছে, তাবুক শহরেরই একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন স্মিত। তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। এই বিষয়ে পরে সবিস্তার জানাবে ভারতীয় দূতাবাস।
জানা গিয়েছে, গুজরাতি বংশোদ্ভূত স্মিত ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্পাইসজেটে বিমান চালিয়েছেন। ১১ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে দুবাইয়ের সংস্থায় যোগ দেন তিনি। সূত্রের খবর, বোয়িং৭৩৭ বিমানের বিশেষজ্ঞ স্মিত। নিজে বিমান চালানোর পাশাপাশি অন্য পাইলটদের মেন্টরিংয়ের কাজও তিনি করেছেন। ওয়েলিংকর ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের বিজ়নেস অ্যাডমিনস্ট্রেশনের ডিগ্রি রয়েছে তাঁর।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, বিমানটি ‘হাইজ্যাক’ করার চেষ্টা হয়েছিল। ককপিটে গোলমালের খবর পেয়েই সকলে আতঙ্কিত হয়ে প়ড়েন। যাত্রীদের আসনেও কয়েক জন পাইলট ছিলেন। তাঁরা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে নিরস্ত্র করেন এবং বিমানটিকে সামাল দেন কোনও রকমে। ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ১৭ হাজার ফুট নীচে নেমে গিয়েছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ককপিট। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিমান সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। যে কোনও মুহূর্তে তা ভেঙে পড়বে বলে তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন। তবে নিরাপদেই সকলে সৌদিতে নেমেছেন।