সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে কাদামাটির হড়পা বান। কোনও রকমে বেঁচেছে প্রাণটুকু। সেই প্রাণ বাঁচাতে এখন ভরসা সরকারি ত্রাণশিবিরের আশ্রয় আর সেখান থেকে পাওয়া খাদ্য। এ বার ভয় সেই খাবারেই। সংক্রমণের ভয়।
এ ধরনের বিপর্যয়ের পরবর্তী সময়ে সর্বক্ষেত্রেই সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষত যেখানে প্রাণহানির (মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর) সংখ্যা অনেক। নেপালে এখনও প্রতিদিন মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে। শনিবার সকাল পর্যন্ত ১২৮৭টি দেহ উদ্ধার হলেও এখনও খোঁজ মেলেনি প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষের। ধরেই নেওয়া হচ্ছে, এঁদের মধ্যে এখনও কেউ বা কেউ কেউ বেঁচে থাকলেও তা সংখ্যায় বড়সড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ, বহু মৃতদেহ এখনও বিপর্যয়স্থল জুড়ে নানা ভাবে আটকে রয়েছে। মানুষের সঙ্গে রয়েছে গবাদি ও অন্যান্য পশুও। প্রতিদিনই কোথাও কাদামাটি খুঁড়ে পাওয়া, কোথাও জলে ভেসে আসা দেহ মিলছে। ফলে সর্বত্রই এই সব পচা, আধপচা, গলে যাওয়া মৃতদেহ থেকে বাতাস-সহ অন্য মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা প্রবল।
আরও পড়ুন:
এনডিটিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যা-বিপর্যস্ত দেবীঘাট এলাকায় একটি বিদ্যালয় ভবনকে ত্রাণশিবির হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি অস্থায়ী ছাউনির তলায় ত্রাণসামগ্রী গুছিয়ে রাখা হচ্ছে। বাইরে থেকে এনে জমা করা হচ্ছে খাবারদাবার। বন্যা-বিপর্যস্তেরা নাম-ঠিকানা নথিভুক্ত করিয়ে পাচ্ছেন ‘রিলিফ কার্ড’। এই ‘কার্ড’-এর ভিত্তিতেই আগামী কয়েক মাস তাঁরা বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাবেন। চাল, ডাল, রুটি, কম্বল, জলের বোতল, প্রভৃতি সামগ্রী তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে এবং হবে।
শিবিরের আশপাশ জুড়ে এখনও ধ্বংসস্তূপ আর ধ্বংসস্তূপ। সরানোর কাজ শেষ করা যায়নি। মাঝেমধ্যে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে দেহ। সর্বত্র ভনভন করছে মাছি। চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা জৈব বর্জ্য থেকে বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে, এই সতর্কবার্তা বার বার প্রচার করা হচ্ছে সরকার বা প্রশাসনের তরফ থেকে। ত্রাণশিবিরে জমিয়ে রাখা খাদ্যসামগ্রী সম্পর্কে বিশেষ সতর্কতা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
আপাতত শুধু বেঁচে থাকার যুদ্ধ, শিবিরে থাকা সবহারানো মানুষগুলোর কাছে। এর মধ্যেই উঁকি দিচ্ছে ভবিষ্যতের চিন্তা। ঘুরে দাঁড়াবেন কী ভাবে? এনডিটিভির প্রতিবেদকের কাছে শিবিরে আশ্রিত এক মধ্যবয়সি ব্যক্তি জানালেন, তাঁর বাড়িটি ভেসে গিয়েছে। পাশে দাঁড়ানো আরেক জন বলেন, ‘‘এখান থেকে খাবার-দাবার পাচ্ছি। জামাকাপড় পেয়েছি। কিন্তু আমার বাড়িটা তো বাঁচাতে পারলাম না। আমি শ্রমিকের কাজ করি। আবার বাড়ি বানানোর খরচ কোথায় পাব?’’ বলেন, ‘‘কিছু টাকাপয়সা, ধান, ইত্যাদি জমিয়েছিলাম। কয়েকটা গরুও ছিল। সব হারিয়ে গেল।’’
শিবির থেকে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি জানালেন, দেবীঘাট অঞ্চলে তাঁর কাঠের ব্যবসা ছিল। বাড়ির অর্ধেকটা বন্যায় ভেসে গিয়েছে। বাড়ি ভেঙে নতুন করে বানাতে হবে। ব্যবসা আবার নতুন করে শুরু করবেন কী ভাবে, সেটাই চিন্তার। আদৌ পারবেন তো?
২৬ অগস্ট হড়পা বানে ভেসে গিয়েছিল এই সব মানুষগুলোর সবকিছু। দেখতে দেখতে ১০ দিন হয়ে গেল। আপাতত ত্রাণশিবিরের আশ্রয়ে আর সংক্রমণ বাঁচিয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধ সবারই। তার পর নতুন করে শুরু হবে আর এক যুদ্ধ, নতুন করে সব গড়ে তোলার চেষ্টা। শিবিরের বাইরে খেলা করছিল চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্র। এখন পড়াশোনা বন্ধ। স্কুলবাড়িটা বেঁচে গেলেও সেটাই এখন অস্থায়ী ত্রাণশিবির। একটু দূর থেকে ছুটে আসছিল একটা বাচ্চা মেয়ে। সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, স্কুল তাড়াতাড়ি চালু হলে ভাল লাগবে তো? ছেলেটি মেয়েটিকে দেখিয়ে ইশারায় বুঝিয়ে দিল, তারা এখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, এ সবের উত্তর দেওয়ার মতো সময় নেই। তার পর দু’জনে মিলে আবর্জনার স্তূপ কাটিয়ে দৌড় দিল কিছু একটা লক্ষ করে।