সুদূর নিউ জ়িল্যান্ডে আমাদের বসন্তের দুর্গাপুজোর গল্প বলি।দক্ষিণ গোলার্ধে যখন প্রকৃতি নতুন রঙে সেজে ওঠে, তখনই আমাদের কাছে আসে শারদোৎসব। ঋতু আলাদা, দেশ আলাদা— তবু মায়ের আগমনের আনন্দে বাঙালির মন তো একই রকম।
গত বছর আমাদের দুর্গাপুজোর দশ বছর পূর্তি ছিল। সেই বিশেষ বছরটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ছিল বেশ কিছু আয়োজন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য— কুমোরটুলি থেকে পুত্র-কন্যা-সহ নতুন প্রতিমা এসে পৌঁছেছিল ক্রাইস্টচার্চে।
লিটলটন বন্দরে প্রতিমা পৌঁছনোর সেই দিনটির কথা এখনও মনে পড়ে। দূর থেকে প্রতিমাবাহী জাহাজটিকে দেখতে পাওয়ার মুহূর্তে বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠেছিল। এত দূরের দেশে থেকেও মনে হয়েছিল, মা যেন সত্যিই আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছেন। সেই বিশেষ অনুভূতিটা আজও মাঝেমধ্যে মনের মধ্যেউঁকি দেয়।
২০২৬-এর পুজোর প্রস্তুতি এখন পুরোদমে চলছে। গত দু’বছর ধরে আমাদের পুজোর ঠিকানা একটি বড় পার্কের প্রান্তে অবস্থিত ‘মাল্টিকালটারাল সেন্টার’। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য স্থানীয় পরিষদের এই উদ্যোগ। আমাদের জন্যও এটি যেন একেবারে আদর্শ জায়গা—খোলা আকাশ, চারপাশে সবুজ আর তার মাঝেই পুজোর আনন্দ।
পার্কের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে বসন্তের প্রকৃতিকে সঙ্গী করে হয় মধ্যাহ্নভোগের আয়োজন। বাঙালির চেনা ভোগের পদ, নানা মিষ্টি আর সুস্বাদু খাবার নিয়ে সে এক জমজমাট আসর। শুধু বাঙালি নয়, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও সানন্দে যোগ দেন সেই ভোজে। পুজো তখন আর শুধু আমাদের থাকে না— হয়ে ওঠে সকলের উৎসব।
তবে পুজোর আসল ব্যস্ততা শুরু হয় তার অনেক আগে থেকেই। প্রতিমা সাজানো, মণ্ডপ তৈরি, পুজোর যাবতীয় প্রস্তুতি— সবই আমাদের নিজেদের হাতে। কোনও ডেকরেটর নেই, বাইরে থেকে লোক এনে কাজ করানোরও চল নেই। নিজেরাই বাজার করি, নিজেরাই মশলা তৈরি করি, নিজেরাই পুজোর খুঁটিনাটি সামলাই। ভোগের প্রস্তুতিও চলে সেইব্যস্ততার মধ্যেই।
আর প্রতি শনিবার? সে তো মহড়ার দিন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রিহার্সাল, পুজোর পরিকল্পনা, কে কী করবেন— সব নিয়ে চলে একের পর এক বৈঠক। পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় এই ব্যস্ততা।
আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও থাকে নানা বৈচিত্র। বাঙালির গান, নাচ, আবৃত্তির পাশাপাশি অন্য ভারতীয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতির পরিবেশনাও থাকে সেখানে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে নিজেদের প্রতিভা নিয়ে এই অনুষ্ঠানে অংশনিতে পারেন, তার জন্যও থাকে বিশেষ উদ্যোগ। ফলে পুজোর মঞ্চটিওহয়ে ওঠে নানা ধরনের সংস্কৃতির মিলনমঞ্চ।
আর একটি স্বপ্নের কথা না বললেই নয়। বহু দিনের ইচ্ছে ছিল— নিউ জ়িল্যান্ডের মাটিতেও যেন পুজোর সময় বাংলার ঢাকের আওয়াজ শোনা যায়। গত বছর সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। নিজের সঙ্গে ঢাক নিয়ে এসেছিলেন আমাদের এক সদস্য। ঢাকের সেই চেনা আওয়াজ যখন বিদেশের আকাশে ভেসে উঠল, তখন মুহূর্তের জন্য দেশের সঙ্গে দূরত্বটা যেন মুছে গেল। মনে হল, কলকাতার কোনও পুজো মণ্ডপেই দাঁড়িয়ে আছি।
প্রবাসে পুজোর আনন্দে এমন মুহূর্তই তো সবচেয়ে বড় পাওনা।