এক বছরেরও বেশি সময় ধরে উত্তপ্ত পাক-অধিকৃত কাশ্মীর। গত কয়েক সপ্তাহে ইসলামাবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলেছে সরকারি দমনপীড়নও। এই উত্তেজনার মাঝেই সোমবার শুরু হল পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের প্রাদেশিক আইনসভার ভোট। তিন দফার এই ভোট চলবে আগামী ১০ অগস্ট পর্যন্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষও হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন প্রতিবাদী নিহত হয়েছেন। জখম হয়েছেন আরও অনেকে। বিক্ষোভের মাঝেই পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের নাগরিক মঞ্চ ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার। এই সংগঠনের নেতৃত্বেই সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কর্মসূচিগুলি চলছিল অধিকৃত কাশ্মীরে। সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়ার পরে সেখানে সাধারণ জনতার ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়।
অর্থনৈতিক সঙ্কট, সাধারণ নাগরিকদের প্রতি বঞ্চনা, একের পর এক বিধিনিষেধ চাপানোর জেরে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে দীর্ঘ দিন ধরেই ক্ষোভ জমছিল। তার উপরে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা এই বিক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সাম্প্রতিক দমনপীড়ন এবং বিধিনিষেধের জেরে অধিকৃত কাশ্মীরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ এবং খাদ্যশস্যের, বিশেষ করে ভর্তুকিযুক্ত গমের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বছরের পর বছর অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের আর্থিক ভাবে শোষণ করা হয়, এমন অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট। সেখানে যে বাঁধগুলি রয়েছে, তাতে অনেক বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। অথচ সাধারণ নাগরিকদের প্রায়শই ১৫-২০ ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের শিকার হতে হয়। বিদ্যুতের মাসুলও বেশি নেওয়া হয় বলে ক্ষোভ অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের।
শাহবাজ় শরিফের সরকার ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পরে সেখানে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সংগঠনের নেতা সর্দার আমন খানের একটি ভিডিয়োও ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে (যার সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। প্রকাশ্যে আসা ওই ভিডিয়োয় ভারতের কাছ থেকে সাহায্য চাইছেন আমন।
আরও পড়ুন:
ওই ভিডিয়ো প্রসঙ্গে ভারত সরকার কোনও মন্তব্য করেনি। তবে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং সেখানে চলতে থাকা সরকারি দমনপীড়ন নিয়ে মুখ খুলেছে নয়াদিল্লি। জানিয়েছে, অধিকৃত কাশ্মীরের সাধারণ জনতার ক্ষোভ আসলে ইসলামাবাদের অর্থনৈতিক শোষণ, মৌলিক অধিকার হরণ এবং প্রশাসনিক নিপীড়নের প্রতিফলন। কাশ্মীরের ওই অংশ যে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং সেটি পাকিস্তান অবৈধ ভাবে দখল করে রেখেছে, তা-ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লির এই বিবৃতির কয়েক দিন পরেই রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের দফতরও পাক-অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে মুখ খোলে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময়ে যত মৃত্যু হয়েছে, তার নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তারা।
অধিকৃত কাশ্মীরের শাসন ক্ষমতা বর্তমানে রয়েছে জেলবন্দি ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ইনসাফের হাতে। ২০২১ সালে সেখানে শেষ ভোট হয়েছিল। ওই সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইমরান। অধিকৃত কাশ্মীরের আইনসভা যে ভাবে গঠিত, তাতে ইসলামাবাদ যার দখলে থাকবে আইনসভার ভোটে জয়ের সম্ভাবনাও তার-ই বেশি। কারণ, ৫৩ আসনের এই আইনসভায় ১২টি আসন সংরক্ষিত থাকে অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দা নন, এমন প্রতিনিধিদের জন্য। ইসলামাবাদ সাধারণত সেখানে নিজের অনুগতদেরই বসায়।
বিশ্লেষকদের দাবি, ইসলামাবাদে ক্ষমতাসীন দলই যে সাধারণত পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের নির্বাচনে জয়ী হয়, তার অন্যতম প্রধান কারণ এই অবাসিন্দাদের সংরক্ষণ। যেমন— ২০১১ সালে পাকিস্তান পিপলস পার্টি, ২০১৬ সালে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ জিতেছিল অধিকৃত কাশ্মীরের ভোটে। গত বার জেতে ইমরানের দল।