কঠোর এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও পিছু হটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘লিন্ডসে ও গ্র্যাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ বিল প্রয়োগের ঠিক আগের দিন তিনি জানিয়েছেন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক মকুব করা হচ্ছে। ট্রাম্পের কথায়, ‘‘জাতীয় স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত জরুরি ছিল।’’ আমেরিকার এ হেন সিদ্ধান্তের ফলে শুল্ক সংক্রান্ত শঙ্কা থেকে বড় স্বস্তি পাচ্ছে ভারত এবং চিন। কিন্তু আমেরিকার অন্যান্য আইনপ্রণেতা এবং রাজনীতিক একে স্রেফ ‘হার’ হিসেবে দেখছেন। নিজের দেশে সমালোচিত হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান থেকে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক, দুই তরফেরই আঙুল ট্রাম্পের দিকে। কেউ কটাক্ষ করে বলছেন ‘পুতিনের হাতের পুতুল’। কারও দাবি, রাশিয়ার কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গত মাসে ‘লিন্ডসে ও গ্র্যাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ নামক বিলে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প। বিলটির নামকরণ করা হয়েছিল ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান সমর্থক সেনেটর লিন্ডসে গ্র্যাহামের নামানুসারে। সংশ্লিষ্ট আইনের লক্ষ্য হল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক সম্পদ হ্রাস করা। তা ছাড়া রাশিয়ার ব্যাঙ্ক থেকে জ্বালানি খাত এবং সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারী বিদেশি সত্তাগুলিকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল এবং গ্যাস ক্রয়কারী দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পথ প্রশস্ত করে ফেলেছিল আমেরিকা। ফলে ওই বিলের দরুন রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল এবং গ্যাস ক্রয়কারী দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পথ প্রশস্ত করতে পারত আমেরিকা। যা ভারত এবং চিনের জন্য উদ্বেগের ছিল।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যাওয়ায় দেশের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বিষোদগার করেছেন রিচার্ড ব্লুমেন্থাল। তাঁর দাবি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন ট্রাম্প। প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সঙ্গে ‘লিন্ডসে গ্রাহাম আইন’ তৈরিতে ভূমিকা রাখা ওই সেনেটর বলেন, ‘‘অধিকাংশ আমেরিকান এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষের প্রতিনিধি তথা ইউরোপীয় সহযোগীদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।’’ এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেছেন, ‘‘এই ছাড়ের সঙ্গে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার কোনও সম্পর্ক নেই। বরং এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভাবে ভ্লাদিমির পুতিনকে তোষামোদ করার জন্য। আমি আশা করি, আমার রিপাবলিকান সহকর্মীরা আমার সঙ্গে এই কাপুরুষোচিত ও ন্যক্কারজনক পদক্ষেপের নিন্দা জানাবেন।’’
রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের প্রধান ক্রেতাদের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কর্তৃত্ব দেওয়া আইন কার্যকর না করায় ট্রাম্পের সমালোচনায় মুখর ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি ডন বায়ারও। রাশিয়ার উপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পুতিনের দেশ তাদের ডিজেল সরবরাহ করবে, এমন একটি চুক্তির পরে ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা মকুবের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যা ডনের কাছে ট্রাম্পের ‘আত্মসমর্পণ’। তাঁর কথায়, ‘‘এই পদক্ষেপ পুতিনের কাছে ট্রাম্পের সর্বশেষ আত্মসমর্পণ।’’ তাঁর ব্যাখ্যা, আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করার শাস্তি হিসেবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আইন আনা হচ্ছিল। কিন্তু সংসদীয় উদ্দেশ্যকে লঙ্ঘন করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামও ট্রাম্পকে আরও তীব্র ভাবে বিঁধেছেন। রাশিয়া সম্পর্কিত পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে সমাজমাধ্যম পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘কেউ একজন পুতিনের কাছ থেকে অর্থ পাচ্ছেন।’’ ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি টেরেসা লেজার ফার্নান্ডেজ় ট্রাম্পকে ‘পুতিনের হাতের পুতুল’ বলে অভিহিত করেছেন।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে পুতিনের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লক্ষ টনেরও বেশি ডিজ়েল সরবরাহ করবে তাঁদের। আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লক্ষ টন ডিজ়েল পাঠাবে পুতিনের দেশ। তার পর আবার আরও ১০ লক্ষ টন জ্বালানি সরবরাহ করবে। এই ‘ডিজ়েল চুক্তি’-র সমালোচনায় মুখর হয়েছেন রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটের উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই। তাঁদের মতে, এমন সমঝোতা বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যে বড় কোনও প্রভাব তো ফেলবেই না। উল্টে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে।